ঢাকার সাভারে ভয়াবহ রানা প্লাজা ধসের স্মৃতি এখন আমাদের কাছে অনেকটাই ধূসর। তবে সেই দুর্ঘটনায় আহতদের কাছে নয়। ২০১৩ সালের আজকের এই দিনে অর্থাত্ ২৪ এপ্রিল ঘটেছিল সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনাটি। রানা প্লাজার ৯ তলা ধসে নিহত হয়েছিলেন ১ হাজার ১৩৪ জন আর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন হাজারো নারী-পুরুষ পোশাক শ্রমিক।
আজ সেই দুর্ঘটনার আট বছর পূর্ণ হলেও বিভীষিকাময় সেই স্মৃতি আজও তাড়া করে ফিরছে দুর্ঘটনায় পঙ্গুত্ববরণকারীদের। তাদেরই একজন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর রেবেকা বেগম। আজও তিনি কেঁদে কেঁদে খুঁজে ফেরেন তার হারানো স্বজনদের। যদিও জানেন, তারা সবাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কিন্তু মন যে মানে না কোন সান্ব্তনা। রেবেকা সেই দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন তার মা, দুুই দাদি, দুই চাচাতো ভাই ও বোনকে। একই সঙ্গে হারিয়েছেন নিজের দুইটি পা। রেবেকা বেগম ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মোস্তাফিজুর রহমানের স্ত্রী।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে বারাইহাট গ্রামে গিয়ে দেখা যায় স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান, মেয়ে মিজরাতুল মুনতাহা (৬) ও ছেলে মাদানি আন নূরের (২) পাশে বসে নতুন বাড়ি নির্মাণের কাজ দেখছেন রেবেকা বেগম। রেবেকার নতুন বাড়ির স্বপ্নটি পূরণ করেছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। ঐ সংস্থাটির কাছে আবেদন করেই নতুন পাকা বাড়ি পেয়েছেন তিনি।
রেবেকা বেগম বলেন, ‘রানা প্লাজার পোশাক কারখানায় আমি, আমার মা, দুই দাদি, দুই চাচাতো ভাইবোন ও এক ফুফু শ্রমিক হিসেবে কর্মরত ছিলাম। হঠাত্ করেই ঐ ভবনে ফাটল দেখা যায়। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে বলা হলেও তারা সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে সাফ জানিয়ে দেয়—তোমরা কাজ করতে এসেছ কাজ করো, না হলে চাকরি থেকে বের করে দেওয়া হবে। চাকরি হারানোর ভয়ে হাজারো শ্রমিকের মতো আমরাও কাজে চলে যাই। কাজ করতে করতে হঠাত্ করেই ভবনটি ধসে পড়ে। তারপর আর কিছুই মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি আমার দুইপা ভবনের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। আমার চিত্কার শুনে উদ্ধার কর্মীরা ছুটে আসে। তারা আমার স্বামীর সহযোগিতায় আমাকে উদ্ধার করে হাপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে আমার দুই পা কেটে ফেলা হয়। হাড় বেড়ে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত আটবার আমার পা কাটতে হয়েছে। আবারও হাড় বেড়ে যাওয়ায় অসহ্য ব্যথা হচ্ছে। হাড় আবার কাটতে হবে বলে চিকিত্সকরা জানিয়েছেন। ঐ দুর্ঘটনায় শরীরের দুইটি অঙ্গ হারানো শ্রমিকদের ১৫ লাখ টাকা দেওয়া হলেও আমি দুইটি পা হারানোর পরও শুধুমাত্র চিকিত্সকদের রিপোর্টে ‘আমি একটি পা হারিয়েছি’—এমন তথ্য থাকায় আমাকে ১৫ লাখের পরিবর্তে দেওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, প্রাপ্য বাকি ৫ লাখ টাকা পেতে তিনি যেন আমাকে সহযোগিতা করেন।’
রেবেকার স্বামী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সেই দুর্ঘটনার স্মৃতি আজো রেবেকাকে তাড়া করে বেড়ায়। মাঝেমধ্যেই রেবেকা বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেই দুর্ঘটনাই আমাদের সুন্দর সংসার তছনছ করে দিয়েছে।’
ব্র্যাকের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক আশরাফ হোসাইন বলেন, পঙ্গুত্ববরণকারী রেবেকার পাশে দাঁড়িয়েছে ব্র্যাক। রেবেকার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। আজ শনিবার সকাল ১১টায় বাড়িটি রেবেকা বেগমের কাছে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে হস্তান্তর করা হবে।
