গত বছরের মার্চ থেকে আঘাত হানা করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থমকে যায়, লন্ডভন্ড হয়ে যায় আমাদের অনেক অর্জন। এবছর আবারও মার্চের শেষ দিক থেকে করোনা প্রচণ্ডভাবে আঘাত হেনেছে আমাদের দেশে। অর্থনীতি যখন ঘুরতে শুরু করেছে, তখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শঙ্কা জাগাচ্ছে।
আসন্ন রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে অর্থনীতি চাঙা হওয়ার প্রত্যাশা করেছিল ব্যবসায়ীরা। সরকার ভ্যাকসিন কার্যক্রম শুরু করার পর করোনা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থনীতিতে চাঞ্চল্য ফিরে আশার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিদিনই করোনার আঘাত তীব্রতর হচ্ছে নতুন করে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায়। ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবীদের কপালে ভাঁজ পড়েছে। অনেকেই বলছে, দ্বিতীয় ধাক্কায় অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান উঠে দাঁড়াতে পারবে না। বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থা ইতিমধ্যে আভাস দিয়েছে, নতুন এই ধাক্কা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। গত জুন মাসের পর অর্থনীতি যে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তা বাধাগ্রস্ত হবে।
প্রথম ধাক্কা সামলে নেওয়ার আগেই দেশে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ে এখন তো বড় রকমের দুর্যোগ চলছে। করোনার প্রথম ধাক্কার রেশ এখনো কাটেনি। ফলে দেশের অর্থনীতিতে একটা বড় মাত্রায় অভিঘাত আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছর নির্ধারণ করেছে, তা অর্জন করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিপিআরসি ব্র্যাকের সম্প্রতিক এক জরিপে বলা হয়েছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে এই নতুন দরিদ্র শ্রেণির সংখ্যা জনসংখ্যার ১৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ হয়েছে। ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত যা ছিল ২১ দশমিক ২৪ শতাংশ। করোনার এই আঘাত ছাড়াও আমাদের দেশে অনেক দিন ধরেই ক্রমান্বয়ে আয় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে আয় বৈষম্য আরো বৃদ্ধি পাবে।
করোনা মহামারির প্রকোপ যদি না কমে তাহলে কর্মসংস্থান তৈরি করা চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়বে। গতবারের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, দেশে খেটে খাওয়া সাধারণ শ্রেণির মানুষজনই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় শক্তি প্রবাসী আয়। করোনার প্রথম ধাক্কায় প্রবাসী আয় না কমলেও মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিক যাওয়া ব্যাপক কমেছে। ফলে মাসওয়ারি ভিত্তিতে প্রবাসী আয় কমতে শুরু করেছে। দ্বিতীয় ধাক্কায় পরিস্থিতি আরো বেগতিক হতে পারে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২০ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত আগের বছরের তুলনায় প্রবাসে শ্রমিক যাওয়া কমেছে ৭১ শতাংশ। এর প্রভাবও পড়েছে প্রবাসী আয়ে। গত সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে আগের মাসের তুলনায় প্রবাসী আয় কমেছে।
করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে দেশের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, এসব খাতেই দেশের ৩৫ শতাংশ কর্মসংস্থান হয়। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা এই খাতে। প্রথম ধাক্কায় অনেকেই লোকসানে পড়েছেন। এখন কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন কিন্তু দ্বিতীয় ধাক্কায় তারা আর দাঁড়াতে পারছেন না।
করোনায় থমকে যাওয়া অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ব্যাংক খাতে। গত বছরের প্রথমার্ধ এবং ষান্মাসিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফায় মারাত্মক ধস নামে। বছর শেষে ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায়ও বড় ধাক্কা লাগে। এ সময়ে বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমে যায়। বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, প্রায় ১৬টি বেসরকারি ব্যাংকের মুনাফা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ছিল। অল্প কয়েকটি ব্যাংক মুনাফায় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। এ বছর প্রথম ব্যাংক খাতে চাঞ্চল্য ফিরে আসছিল। কিন্তু দ্বিতীয় ধাক্কায় ব্যাংকগুলোর ক্ষতি কোথায় নিয়ে যায় তা নিয়ে ব্যাংকারদের মধ্যে উত্কণ্ঠা তৈরি হয়েছে।
ইত্তেফাক/কেকে
