তাহাদের চক্ষুলজ্জা তৈরি হয় নাই

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৮

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বাঘাবাড়ী রিভারাইন ওয়েল ডিপোর বিপণনকেন্দ্রে একটি অসাধু চক্র পেট্রোলে কেরোসিন মিশাইয়া কোটি কোটি টাকা হাতাইয়া লইতেছে মর্মে পত্রিকান্তরে খবর প্রকাশ হইয়াছে। খবরে বলা হইয়াছে, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানির বিপণনকেন্দ্র হইতে প্রতিদিন ১৯ জেলায় ৫ লক্ষাধিক লিটার নিম্নমানের পেট্রোল সরবরাহ করা হইতেছে। ডিপোতে প্রতি লিটার পেট্রোল ৮১.৫৬ টাকা, কেরোসিন ৬৩.৫৬ টাকা দরে বিক্রয় করা হয়। সেই হিসাবে পেট্রোলে কেরোসিন মিশাইয়া সংশ্লিষ্টরা প্রতি লিটারে ১৮ টাকা হাতাইয়া লইতেছে।

আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে কত ধরনের চুরি রহিয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। এইখানে চুরিবিদ্যাকে বড় বিদ্যা বলিয়া মনে করা হয়। যাহারা এই বিদ্যা না পড়িবে, তাহারাই পিছাইয়া পড়িবে—এমনটিই আমাদের সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। চুরির ভাগ লইতে চাহে না এমন সততাসম্পন্ন মানুষ আতশকাচ দিয়া খুঁজিয়া দেখিতে হইবে। সুতরাং শুরুতেই স্পষ্ট করিয়া বলিয়া ফেলা ভালো—চুরি কোথায় নাই? সরাসরি চুরি না করিলেও বলা হইয়া থাকে, কোনো না কোনোখানে ভাবের ঘরে চুরি না করিয়া সমাজ ও রাষ্ট্রযন্ত্রে কেহ বসবাস করিতে পারেন না। বিষয়টি ফিলসফিক্যাল। আমরা অতখানি জটিলতায় না গিয়া কেবল বলিতে পারি, চুরি কখনো শতভাগ প্রতিহত করা যায় না। সম্পূর্ণ ন্যায় বলিয়া যেমন কিছু হয় না, তেমনি চুরিমুক্ত বিশ্ব গঠন করা সম্ভব নহে। উহা কিতাবে সম্ভব হইলেও হইতে পারে, বাস্তবে নহে। সুতরাং অন্যায়টা কতখানি কমাইয়া আনা যায় তাহাই দেখিবার বিষয়। সমস্যা হইল, আমাদের দেশে বহুক্ষেত্রেই চুরি করা হয় কোনোরূপ রাখঢাক না রাখিয়াই। কতখানি নির্লজ্জ এই সকল চোর! জন্মের সময় তাহাদের চোখে সম্ভবত মা-জননীরা কাজল পরাইতে ভুলিয়া গিয়াছিলেন। সেই কারণে রাখঢাক না করিয়া চুরি করিতে তাহাদের চক্ষুলজ্জা তৈরি হয় নাই। চুরি তো উন্নত বিশ্বেও রহিয়াছে। তবে তাহা সহনীয়। তাহা নির্লজ্জভাবে করা হয় না। চুরির ধরন-প্রকরণও সেইখানে ভিন্ন রকম। উন্নত বিশ্বে অনলাইনে ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাংক প্রতারণার বিপুল ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটিয়া থাকে; কিন্তু এইভাবে রাখঢাক না করিয়া প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধভাবে দিনের পর দিন নির্লজ্জভাবে চুরি করিবার ঘটনা তৃতীয় বিশ্বেই অধিক দেখা যায়।

সমস্যা হইল, আমাদের সমাজে চোরের ভাবমূর্তি এখন আর খুব অধিক কদর্য নহে। চোরের হাতে টাকা ও ক্ষমতা থাকিলে তাহার প্রতাপ ও প্রভাব বাড়ে বই কমে না। এই কারণে আমাদের সমাজে যাহারা সত্, বলা হইয়া থাকে তাহারা সুযোগের অভাবে সত্। অর্থাত্ চুরি করিবার সুযোগ পায় নাই বলিয়া সাধুগিরি দেখাইতেছে। কী ভয়াবহ আমাদের এই সমাজের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি! কিন্তু কেন এমন হইল? এখন একটি শিশু বাংলাদেশে জন্মাইবার পরই ঘরে-বাহিরে দেখিতে পায় চুরি আর দুর্নীতির শত শত ঘটনা। যেই শিশু বা কিশোর দেখিতেছে যে, তাহার পিতা অনিয়ম-দুর্নীতি করিয়া অর্থের পাহাড় তৈরি করিতেছে, তাহার মধ্যে কী করিয়া নীতিবোধ তৈরি হইবে? অথচ আমাদের আদর্শলিপি কিংবা ধর্মগ্রন্থসমূহে সত্ পথে চলিবার এবং চুরি না করিবার অসংখ্য নীতিবাক্য রহিয়াছে। কোনো ব্যক্তি যদি হারাম কোনো বস্তুকে হারাম মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে তাহার কবিরা গুনাহ হইবে। আবার যদি হারাম বস্তুকে হালাল মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে পরিণতি হইবে আরো ভয়াবহ। আখিরাতে সরাসরি জাহান্নাম। কিন্তু অসত্ ব্যক্তিরা ধর্মের এই সকল নীতিকথা কতখানি তাহার জীবনে প্রয়োগ করিয়া থাকেন? সরকারি অফিসের সাধারণ কর্মচারীর ছেলের চেহারা যখন অর্থের পলিশে চকচক করে তখন তাহার প্রতিবেশী মেধাবী বেসরকারি চাকুরে বন্ধুরও বুক চিড়িয়া দীর্ঘশ্বাস বাহির হয় ঘুষ খাইবার ‘ড্রয়ার’ না পাইবার দুঃখে। সুতরাং জাতি হিসাবে আমাদের দৈন্য ঘুচাইতে হইলে চক্ষুলজ্জা তৈরি করিতে হইবে। চোরদের চোখে কাজল পরাইয়া দিতে হইবে।