আমরা কবে করোনামুক্ত হব?

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৯

করোনা মহামারি যখন চীনের উহান প্রদেশ থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং মৃত্যুদানবের বেশে দেখা দেয়, তখন কিছু কিছু চিকিত্সাবিজ্ঞানী বিশ্ববাসীকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, অটাম ও স্প্রিংয়ে (হেমন্ত ও বসন্তে) রোগের প্রাদুর্ভাব কমবে এবং সামারে (গ্রীষ্মকালে) বিশ্ববাসী হয়তো অনেকটাই করোনামুক্ত হতে পারবে। একশ্রেণির বিজ্ঞানীর এই আশাবাদ সঠিক প্রমাণিত হয়নি। বরং দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে করোনার আরো শক্তিশালী ঢেউ বিশ্বের মানুষকে আরো আতঙ্কিত এবং আশাহীন করে তুলেছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে এবং বাংলাদেশ ও ভারতে প্রথম পর্যায়ের করোনার হামলা মোটামুটি প্রতিহত করা গিয়েছিল; কিন্তু দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের আরো শক্তিশালী হামলায় এই দেশগুলো ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে।

বাংলাদেশের যত খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী—ড. আনিসুজ্জামান থেকে কামাল লোহানী এবং কবরী সারোয়ারের মতো খ্যাতনামা অভিনেত্রী—সবাই এখন পরপারে। ভারতে কারফিউ জারি করেও এই মহামারি ঠেকানো যাচ্ছে না। বহু বুদ্ধিজীবী, লেখক ও সাহিত্যিক ভারত ছেড়ে পালাচ্ছেন; কিন্তু পালাবেন কোথায়? সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামা অভিনেতা, শঙ্খ ঘোষের মতো কবি এবং আরো অনেকে করোনার শিকার হয়েছেন। এখন কেউ কারো জন্য কাঁদার সময় ও সুযোগ পাচ্ছেন না। কবির ভাষায়—‘অদ্ভুত আঁধার এক পৃথিবীতে আসিয়াছে নেমে।’ এই আঁধার থেকে কবে পৃথিবী মুক্ত হবে অথবা আদৌ মুক্ত হবে কি না—তা কেউ জানে না।

এখন আর বিজ্ঞানী অথবা চিকিত্সাবিজ্ঞানীরাও বলতে পারছেন না অথবা বলতে চাইছেন না এই মহামারির প্রকোপ কমবে কবে। বরং তারা মানবসমাজকে এই করোনা বীজাণুর আরো শক্তিশালী ভ্যারিয়েশনের হামলা সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছেন। এ যেন মৃত্যুদানবের কোলে ঢলে পড়ার জন্য মানবসমাজের অন্তহীন যাত্রা। করোনার টিকা আবিষ্কৃত হওয়ার পর মানুষের মনে এই দানবের কবল থেকে মুক্তি পাবার যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা ইউরোপের কয়েকটি দেশসহ বাংলাদেশ ও ভারতে মহামারির আরো বিস্তার লাভে অঙ্কুরেই মিলিয়ে গেছে।

মানব ও মানব সভ্যতার এই অন্তহীন বিপদের দিনে কোনো প্রকৃতি বিজ্ঞানী বা চিকিত্সাবিজ্ঞানী নন, একজন রাজনৈতিক নেতা ঘোষণা করেছেন ‘ব্রিটেনে আগামী ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সবাইকে করোনার টিকা দেওয়া শেষ হবে। এটা ব্রিটেনের মানুষের জন্য একটা সুসংবাদ। এই সুসংবাদটি দিয়েছেন ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার; কিন্তু টিকা দিলেই ব্রিটেন এই ভাইরাসের কবল থেকে মুক্ত হবে কি না—সে সম্পর্কে তিনি কিছু বলতে পারেননি। তিনি টিকা-পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এবং অন্য সবার করণীয় কাজ কী, সে সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন।

সমস্যা হলো, করোনা আঞ্চলিক ও দেশভিত্তিক মহামারি নয়। এটা বিশ্ব মহামারি। এক দেশের মানুষকে টিকা দিয়ে বিশ্বব্যাপী এর সংক্রমণ ঠেকানোর উপায় নেই। বিশ্বের সব দেশের মানুষকে টিকা দেওয়া শেষ করার পর মাত্র বলা যাবে সারা দুনিয়ায় রোগ সংক্রমণ কতটা বন্ধ করা যাবে। আর ব্রিটেনে আগামী ডিসেম্বরে টিকাদান শেষ হলেও সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে আফ্রিকার দুর্গম অঞ্চলগুলোতে আগামী ডিসেম্বর মাস কেন পরবর্তী ডিসেম্বর মাসেও টিকাদান শেষ হবে কি না সন্দেহ। সুতরাং অনেকেই চান, বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই মহামারি যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবতে।

এ পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের ‘ফাইজার’ থেকে শুরু করে যে সমস্ত টিকা বেরিয়েছে তার কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে বাজারে বিতর্ক ও মতদ্বৈধতা রয়েছে। কেউ বলছেন, এসব টিকার মানব শরীরে রোগ দমনের কার্যকারিতা সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশের বেশি নয়। স্থায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো টিকারই এক বছরের বেশি স্থায়িত্ব হয়তো নেই। তাহলে এই মহামারি থেকে বাঁচতে হলে বছর বছর এই টিকা দিতে হবে। বর্তমান টিকাদান যেখানে কোনো দেশেই এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। সেখানে দ্বিতীয় দফা টিকাদানের জন্য আরো কত সময় লাগবে তা ভেবে দেখা হয়েছে কি? তাছাড়া করোনার বীজাণু যত দ্রুত দেশে দেশে রোগ-বীজাণুর বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট ছড়াচ্ছে, তাতে এই বীজাণুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের বীজাণুর জন্য কার্যকর টিকা আবিষ্কার দ্রুত করা যাবে কি?

এসব সমস্যা ছাড়া বড় একটি সমস্যা হলো রোগ-পরবর্তী রোগীর চিকিত্সার ব্যবস্থা। যেটাকে বলা হয় ‘পোস্ট ভাইরাল সিনড্রমস। রোগমুক্ত হয়ে যাওয়ার পরও এই রোগের কিছু উপসর্গ রোগীর দেহে থেকে যায়, যা আরো ভয়াবহ। ডেরেক ড্রপার নামক এক রোগীর পরিণতি দেখার পর ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথের ডাক্তারেরা বলছেন, রোগীকে এই সিনড্রম-মুক্ত করা না গেলেও এটার চিকিত্সা চলে। এজন্য স্বতন্ত্রভাবে এসব করোনা-রোগীর যারা রোগমুক্ত হয়েও ভয়াবহ উপসর্গ মুক্ত হন না, তাদের জন্য স্বতন্ত্রভাবে চিকিত্সাব্যবস্থার চিন্তা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে এই পোস্ট ভাইরাল সিনড্রমে বহু রোগী আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন। করোনা রোগ থেকে মুক্ত হয়ে তারা ঘরে ফিরেছেন। ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে; কিন্তু তাদের বাঁচানো যায়নি। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে যেখানে করোনা রোগী ভর্তি করারই বেডের অভাব, সেখানে রোগ-পরবর্তী সিনড্রম থেকে রোগী বাঁচানোর ব্যবস্থা কোথায়?

উপমহাদেশে গ্রীষ্মকাল এবং ইউরোপে সামার শুরু হয়েছে; কিন্তু কোথাও করোনা মহামারির প্রকোপ কমার লক্ষণ নেই। পৃথিবীর অন্তত অর্ধেকেরও বেশি দেশে প্রথম দফা করোনার টিকা অর্ধেকেরও বেশি রোগীকে দেওয়া শেষ হলে করোনার গতিবিধি কিছুটা বোঝা যাবে। এই ব্যাপারে বাস্তববাদীদের দলে থাকাই ভালো। ধরে নেওয়া যাক, করোনা কখনো স্থায়ীভাবে যাবে না, কলেরা, বসন্ত, যক্ষ্মার মতো বিভিন্ন মওসুমে আসবে। মানুষকে সেজন্য প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সিজন এলেই করোনারও টিকা নিতে হবে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষ বহুযুগ ধরে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাকে বেঁচে থাকতে হবে।

অন্যান্য রোগের সঙ্গে করোনা বা কোভিড-১৯-এর পার্থক্য এই যে, করোনা একসঙ্গে সারা বিশ্বে হামলা চালিয়েছে। এটা গ্লোবাল ডিজিজ। বিশ্বায়নের যুগে তাই বিশ্ববাসীকে একযোগে এই রোগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এক্ষেত্রে কে সাদা, কে কালো, কে আন্তর্জাতিক আর কে আঞ্চলিক—তা বিচার করা চলবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকানদের বিচ্ছিন্ন করে রেখে এই রোগকে প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। এই রোগের ভাইরাস ন্যাচারাল নয়, কেমিক্যাল। এখনো এই সন্দেহ নিরসন করা যায়নি যে, চীন অথবা আমেরিকা—কাদের গবেষণাগার থেকে এই মৃত্যুদানব মুক্তি পেয়েছে এবং বিশ্বময় ছড়িয়েছে। বাদুড়কে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সৃষ্টির শুরু থেকে বাদুড় পৃথিবীতে আছে। আর কখনো তো সে এমন মৃত্যুবিষ পৃথিবীতে ছড়ায়নি।

এই বিশ্বব্যাপী ডেডলি ডিজিজের মাত্র একটাই ভালোর দিক। কোনো আদর্শ, কোনো ধর্ম যেখানে বিশ্বের সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনি, করোনা তা করেছে। করোনার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ চলছে, সেই যুদ্ধে সাদাকালো, ধনী-গরিব কম্যুনিস্ট-অকম্যুনিস্ট—সব মানুষ, সব দেশ ঐক্যবদ্ধ। মানুষের সমাজে অনেক প্রথা ও নিয়মরীতি লুপ্ত হতে চলেছে। নতুন নিয়মনীতি আসছে। দুজন মানুষের মধ্যে দেখা হলে শেকহ্যান্ড, কোলাকুলি করা, প্রেমিকদের মধ্যে দেখা হলে চুমু বিনিময় লুপ্ত হতে চলেছে। জনসভা, মিছিল-মিটিং করা সোশ্যাল ডিসট্যান্সের কারণে হচ্ছে না। মানুষের বাজার-সওদা করার নিয়ম তো বদলে যাচ্ছে। কম লোক ঝুড়ি হাতে এখন বাজার করতে ছুটছে। অনলাইনে শপিং চলছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। পাব, সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ঘরে বসে ইন্টারনেটে সিনেমা দেখছে, বই পড়ছে, এমনকি দৈনিক কাগজ পড়ছে।

অর্থাত্ মানুষ ক্রমশ যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছে। যন্ত্রনির্ভর জীবনযাপন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা মানবতার বিকাশের জন্য কল্যাণকর নয়। মানুষ মস্তিষ্ক চর্চা না করলে তার মাথা ছোট হয়ে যাবে। বুদ্ধিবৃত্তি হ্রাস পাবে। করোনা-পরবর্তী বিশ্বসমাজ কেমন হবে, মানুষ তা এখন ভাবতে পারছে না। এখন তার সমস্যা কোভিড-১৯-এর ভয়াবহ হামলা থেকে বেঁচে থাকার। এই যুদ্ধে তাকে জয়ী হতে হবেই।

n লন্ডন, ২৪ এপ্রিল, শনিবার, ২০২১