আরমানিটোলায় আগুন

অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলা

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ০০:১৩

পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় আবাসিক ভবন হাজি মুসা ম্যানশনে আগুন লাগা এবং প্রাণহানির ঘটনায় মামলা হয়েছে। শুক্রবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে এ মামলা করে। ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল রেখে অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগে হাজি মুসা ম্যানশনের মালিক মোস্তাক আহমেদ চিশতি, কেমিক্যাল গোডাউন মালিক  মোস্তাফিজুর রহমান, মোস্তফা, গাফফার, সাইদ, ফিরোজ, তারেক ও বাপ্পীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার বাদী বংশাল থানার এসআই মোহাম্মদ আলী শিকদার। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বংশাল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীন ফকির। তিনি বলেন, অবহেলাজনিত মৃত্যু এবং অবৈধভাবে রাসায়নিক দ্রব্য রাখার দায়ে ভবন মালিক ও গোডাউন মালিকদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছে। জড়িতদের গ্রেফতারে  চেষ্টা করা হচ্ছে।

ওসি আরো বলেন, আমরা প্রথমে অপেক্ষা করেছিলাম যে, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা মামলা করেন কি না। কিন্তু স্বজনরা মামলা করার বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। চার জন নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়ে ঘটনাটি বড় আকার ধারণ করায় পুলিশ মামলা করে।

তিনি বলেন, গোডাউনে কেমিক্যাল রাখা হয়েছিল কোনো অনুমতি ছাড়াই। এমনকি ভবন মালিকের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়ার সময় কোনো দাহ্য পদার্থ রাখা হবে না বলেও জানিয়েছিলেন গোডাউন মালিকরা। এর পরও গোপনে ওই গোডাউনে দাহ্য পদার্থ কেমিক্যাল রাখা হয়। ঘটনা তদন্তে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ। এরপর প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

১০ জুন প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১০ জুন ধার্য করে দিয়েছে আদালত। গতকাল শনিবার মামলার এজাহার আদালতে আসে। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বেগম মাহমুদা আক্তার এজাহারটি গ্রহণ করেন। বংশাল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মীর রেজাউল করিমকে মামলা তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়।

মামলার এজাহারে যা বলা হয়

মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ্য করেন, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে হাজি মুসা ম্যানশনের নিচতলায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি টিম প্রায় সাড়ে ৬ ঘণ্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পুলিশের সহায়তায় বিল্ডিংয়ের ভেতর প্রবেশ করে আহত অবস্থায় ২১ জনকে উদ্ধার করে চিকিত্সার জন্য দ্রুত শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সাজারি ইনস্টিটিউটে পাঠান। পরবর্তীকালে বিল্ডিং তল্লাশি করে তিন জন পুরুষ ও একজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিভাগীয় প্রধান স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে পাঠানো হয়। হাসপাতালের মর্গে মৃত রাসেল (২৮), সুমাইয়া (২২), অলিউল্লাহ (৪৫) ও কবিরের (৪০) মৃতদেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য মৃতদেহ ফরেনসিক বিভাগে পাঠানো হয়।

লাইফ সাপোর্টে  নবদম্পতি

দগ্ধ নবদম্পতি আশিকুজ্জামান ও ইসরাত জাহানকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়েছে। গতকাল সকালে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউ থেকে তাদের লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন  ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন।

তিনি বলেন, আগুনে দগ্ধ ২১ রোগী বার্ন ইউনিটে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে একজনকে চিকিত্সা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আর ২০ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে চার জনকে আইসিইউতে রাখা হয়। এই চার জনের মধ্যে দুজন লাইফ সাপোর্টে আছেন। বাকি দুজনও শঙ্কামুক্ত নন।

ডা. সেন আরো বলেন, রোগীদের বেশির ভাগেরই শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। তাদের কেউ যে বিপদমুক্ত কিংবা ঝুঁকিমুক্ত তা বলা যাবে না। কারণ, এই বার্নটা বাইরে থেকে দেখা যায় না। হঠাত্ রোগীরা খারাপ হয়ে যেতে পারে। আরো সাত-আট দিন পরে রোগীদের শারীরিক অবস্থা বোঝা যাবে।

মাত্র দেড় মাস আগে বাংলাদেশ প্রকৌশল  বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আশিকুজ্জামানের সঙ্গে বিয়ে হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ইসরাত জাহানের।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া ৩টায় আগুন লাগে আরমানিটোলার ছয়তলা ভবনটিতে। ভবনের নিচতলায় কেমিক্যালের দোকান ও গোডাউন ছিল। ওপরের তলাগুলোতে পরিবার বাস করত। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় সকাল সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে ঝরে যায় চারটি প্রাণ।