রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির আট বছর

শ্রদ্ধা ভালোবাসায় হতাহতদের স্মরণ, দোষীদের শাস্তি দাবি

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০২১, ০০:১৬

সাভার রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির আট বছর পূর্তি হলো গতকাল ২৪ এপ্রিল শনিবার। প্রতি বছরের মতো এবারও রানা প্লাজা চত্বরের সামনে এসেছিলেন স্বজন হারানো শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা। আট বছর আগে এই দিনে সাভার বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত বহুতল ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ে, হতাহত হন কয়েক হাজার মানুষ। গতকাল শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করা হয়েছে সেইসব হতভাগ্য মানুষকে, বের করা হয় প্রতিবাদ মিছিল। এছাড়া মোমবাতি প্রজ্বালন, স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে অনুষ্ঠিত হয় সংবাদ সম্মেলন।

সকাল থেকেই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী ও রানা প্লাজা ধসে হতাহত, ক্ষতিগ্রস্ত ও নিখোঁজদের পরিবার-পরিজন ভিড় জমান রানা প্লাজা চত্বরের সামনে। সেখানে অস্থায়ীভাবে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভের বেদিতে ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দও। এরপর আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আউয়ালের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর আগে সাভার মডেল থানা পুলিশের পক্ষ থেকে অস্থায়ী শহিদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এ এফ এম সায়েদসহ পুলিশ সদস্যরা।

শ্রদ্ধা জানাতে আসা ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা জানান, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক শিল্পে আমূল পরিবর্তন আসলেও এখানে ভবন ধসে আহত, পঙ্গু, শ্রমিকদের জীবনে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। বিছানায় শুয়ে এখনো বিনা চিকিত্সায় ধুঁকে ধুঁকে মারা যাচ্ছেন তারা। কিছুদিন আগে আহত শ্রমিক খালেদা বেগম বিনা চিকিত্সায় মারা যান। তার আগে আহত শ্রমিক জুয়েল ও তার স্ত্রী মারা যান।

রানা প্লাজার শ্রমিক হালিমা বেগম কয়েকবার অপারেশন করার পরও অসুস্থ। পায়ে রড লাগানো অবস্থায়ও থেরাপি দিতে হয় তার। রেহেনা আক্তার নামে অন্য এক শ্রমিকের পা কেটে ফেলতে হয় দুর্ঘটনার পর। তীব্র যন্ত্রণায় নীরবে চোখের জল ফেললেও অভাব আর কষ্টের কথা কাউকে এখন আর বলতে চান না। ভবনটির ৬ষ্ঠ তলার শ্রমিক নিলুফা ইয়াসমিন, বাকী বিল্লাহ, রেখা বেগম, আফরোজা বেগম, রাশিদা বেগমসহ অনেক শ্রমিকেরই কোমরে, পায়ে ও মাথায়সহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ব্যথা। হাড় ভেঙে গেছে কারো, কারো আবার অঙ্গহানিসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। দুপুরে রানা প্লাজা সারভাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রানা প্লাজার সামনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।  সংবাদ সম্মেলন থেকে বলা হয়, জাতীয় সংসদ ভবনে দাঁড়িয়ে তত্কালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছিলেন, রানা প্লাজায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১২৭ কোটি টাকা জমা হয়েছে। সেখান থেকে পরবর্তী সময় ২২ কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও ১০৫ কোটি টাকা আমরা আজও পাইনি।

সংবাদ সম্মেলন থেকে ছয় দফা দাবি জানান শ্রমিকরা। দাবিগুলো হলো—ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবারকে এক জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ ৪৮ লাখ টাকা প্রদান, আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসন, শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের আজীবন বিনা মূল্যে চিকিত্সা প্রদান, গার্মেন্টস মালিক ও ভবন মালিকসহ সব অভিযুক্তদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা, তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের সদস্যদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, ২৪ এপ্রিলকে শিল্প শ্রমিক হত্যাকাণ্ড দিবস ঘোষণা ও একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ। 

গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাংগঠনিক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু শ্রম আইন সংশোধন করে হলেও অভিযুক্ত গার্মেন্টস মালিক ও ভবন মালিকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতার বলেন, সরকার ও মালিকরা রানা প্লাজার ঘটনাকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চাইছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস পোশাক শ্রমিকদের আত্মদানকে অস্বীকার করে সম্পূর্ণ হতে পারে না।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ডে যুবলীগ নেতা সোহেল রানার ৯তলা বাণিজ্যিক ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ে। ঘটনার সময় ভবনের পাঁচটি পোশাক কারখানায় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ করছিল। আগের দিন ভবনটিতে ফাটল দেখা দেয়। সকাল ৮টায় বেতন বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে কারখানায় ঢোকানো হয় শ্রমিকদের। শ্রমিকরা কাজে যোগ দেওয়ার ৪০ মিনিট পর হঠাত্ বিকট শব্দে ধসে পড়ে ৬ তলার অনুমোদন নিয়ে অবৈধভাবে ৯ তলা নির্মাণ করা এ ভবনটি। ভবনটিতে পাঁচটি গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানসহ ১৪২টি বিপণিবিতান ছিল। বিশ্বের ভয়াবহতম এ ভবন ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১৩৮ জন মারা যান। আহত হন ২ হাজারেরও বেশি মানুষ।