লাফিয়ে লাফিয়ে করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ বাড়তে থাকায় ভারতের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানী দিল্লির একটি হাসপাতালে অক্সিজেনের সংকটে শুক্রবার এক রাতেই ২৫ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এদিকে পরপর তিন দিন করোনা সংক্রমণের বিশ্ব রেকর্ড হয়েছে ভারতে। গতকাল শনিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে ৩ লাখ ৪৬ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এক দিনে মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬২৪ জনের। পরিস্থিতি ও রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক টড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসুস বলেছেন, করোনা মহামারি কতটা বিধ্বংসী হতে পারে, তার পূর্বাভাস হচ্ছে ভারতের পরিস্থিতি।
এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, দিল্লির জয়পুর গোল্ডেন নামের হাসপাতালে অক্সিজেনের সংকটে শুক্রবার রাতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যেকেই অক্সিজেনের চাপ কমে যাওয়ার কারণে মারা যান। ঐ হাসপাতালের পরিচালক ডা. দীপ বালুজা জানান, হাসপাতালে বর্তমানে থাকা ২০০ রোগীর মধ্যে ৮০ জন অক্সিজেন সাপোর্টে এবং ৩৫ জন আইসিইউতে রয়েছেন।
তিনি হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘শুক্রবার রাত ১০টার মধ্যে হাসপাতালের তরল অক্সিজেনের মজুত শেষ হয়ে যায়। এরপর আমরা কেন্দ্রীয় গ্যাস পাইপলাইনের সঙ্গে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংযোগ করে দিলেও অক্সিজেনের চাপ কম থাকায় রোগীরা মারা যান। শনিবার সকালে হাসপাতালটিতে মাত্র ৪৫ মিনিটের মতো অক্সিজেনের জোগান ছিল বলে দ্য হিন্দু পত্রিকা জানিয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৫টার মধ্যেই হাসপাতালটির অক্সিজেনের জোগান পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মধ্যরাত পর্যন্তও তারা তাদের জন্য নির্ধারিত অক্সিজেন পায়নি। এমনকি ২৫ জন রোগীর মৃত্যুর পরও হাসপাতালটি প্রয়োজনের মাত্র ৪০ শতাংশ অক্সিজেন পেয়েছে। পরিচালক ডা. বালুজা বলেন, ‘আমরা আবারও সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়েছি। ২০০ জনের জীবন এখন ঝুঁকিতে। গত রাতে আমরা অধিকাংশ রোগীকে বাঁচাতে পারলেও আজ তা হয়তো পারব না। আমাদের অক্সিজেনের জরুরি মজুতও শেষ হয়ে গেছে।’
শুক্রবারও দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালে অক্সিজেনের মজুত শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ২৫ জন করোনা রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। এর আগে ২১ এপ্রিল মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরের একটি সরকারি কোভিড হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ বিঘ্নিত হয়ে একসঙ্গে অন্তত ২২ জন রোগী মারা যায়। ঐ হাসপাতালের সামনে একটি ট্যাংকার থেকে অক্সিজেন লিক হওয়ার জেরেই ঐ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় আধা ঘণ্টার মতো হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ ছিল।
অক্সিজেন শেষ হতে চলেছে, রোগীদের বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে অক্সিজেন পাঠান—সরকারকে এমন জরুরি বার্তা দিয়েছে দিল্লির আরো চার হাসপাতাল। তারা বলেছে, পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, রোগীদের ছেড়ে দেওয়াও হতে পারে।
ভারতের কিছু কিছু এলাকার স্বাস্থ্যসেবা খাত তাদের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে হাসপাতালগুলো চরমভাবে অক্সিজেনের সংকটে ভুগছে। অক্সিজেনের তীব্র আকাল এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরো হূদয়বিদারক করে তুলেছে।
উত্তর প্রদেশের রাজধানী লক্ষৌতে রোগীর পরিবারের সদস্যরা সারা রাত ধরে লাইন দিচ্ছেন অক্সিজেন কেনার জন্য। একেকটা সিলিন্ডারের দাম ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু সেটাও এখন পাওয়া যাচ্ছে না বলে বিবিসির খবরে বলা হয়েছে। তবে পূর্ব ভারতে অক্সিজেনের ঘাটতি এখনো হয়নি। যেহেতু ইস্পাতশিল্পের কারখানাগুলো সেখানে অবস্থিত। ঐ কারখানাগুলোতেই শিল্পের জন্য অক্সিজেন মজুত থাকে, তারা চিকিত্সার জন্যও অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারে। তাই এই অঞ্চল থেকেই অক্সিজেন যেতে শুরু করেছে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। তবে এই কাজটা আরো আগে শুরু করা উচিত ছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সরবরাহ বাড়াতে অতিরিক্ত ট্রেন মোতায়েন করেছে সরকার। সেই সঙ্গে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিমান বাহিনীকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। খবর পাওয়া যাচ্ছে, জার্মানি থেকেও অক্সিজেন পাঠানো হচ্ছে।
অক্সিজেনের সংকটে মৃত্যুর ঘটনা এমন সময়ে ঘটছে, যখন এক দিনে সবচেয়ে বেশি করোনা সংক্রমণের দিক থেকে টানা তৃতীয় দিনের মতো বিশ্বে রেকর্ড করেছে ভারত। গত তিন দিনে দেশটিতে প্রায় ১০ লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এদিকে এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ভারতে দৈনিক কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ৫ হাজার ৬০০। তার ফলে ১২ এপ্রিল থেকে ১ আগস্টের মধ্যে কোভিডে মৃত্যু হতে পারে আরো প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার মানুষের। আমেরিকার ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইনস্টিটিউট ফর হেল্থ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন (আইএইচএমই)’-এর সাম্প্রতিক গবেষণা এই খবর দিয়েছে।
অক্সিজেন সরবরাহে বাধা দিলে ফাঁসি :দিল্লি হাইকোর্ট
ভারত সরকারকে সতর্ক করে দিল্লি হাইকোর্ট গতকাল বলেছে, কোভিড রোগীদের অক্সিজেন সরবরাহে গাফিলতি দেখলে কেন্দ্র, রাজ্য বা স্থানীয় স্তরের কোনো আমলাকেই ছেড়ে কথা বলা হবে না। প্রয়োজনে তাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে আদালত। দেশে কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউকে ‘সুনামি’ আখ্যা দিয়ে দিল্লি হাইকোর্ট একটি মামলার পর্যবেক্ষণে বলেছে, হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন সরবরাহ পর্যাপ্ত পরিমাণে হচ্ছে না। গতকাল দিল্লি সরকার আদালতকে জানিয়েছে, তারা ৪৮০ মেট্রিক টন অক্সিজেন জরুরি ভিত্তিতে না পেলে সিস্টেম ভেঙে পড়বে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রকে স্পষ্ট করে জানাতে বলা হয়েছে, সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কবে দিল্লিতে ৪৮০ মেট্রিক টন অক্সিজেন পৌঁছাবে।
ভারতের পরিস্থিতি করোনার বিধ্বংসী পূর্বাভাস :বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
ভারতের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ। পরিস্থিতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেছেন, করোনা মহামারি কতটা বিধ্বংসী হতে পারে, তার পূর্বাভাস ভারতের বর্তমান অবস্থা। তার মতে, শুধু ভ্যাকসিনের অভাবই বিশ্বে করোনার সংক্রমণ বাড়ার কারণ। ভ্যাকসিনেশন পর্যাপ্ত পরিমাণে হচ্ছে না, টেস্টিং হচ্ছে না, হচ্ছে না চিকিত্সাও।
করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভারতীয়দের পাশে আছি :ইমরান খান
ভারতের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। পাশাপাশি, এই লড়াইয়ে ভারতের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে শনিবার টুইট করেছেন তিনি। ইমরান বলেন, ‘বিপজ্জনক কোভিড-১৯ ঢেউয়ের বিরুদ্ধে ভারতবাসীর লড়াইয়ের প্রতি সংহতি প্রকাশ করছি। প্রতিবেশী দেশ এবং বিশ্ব জুড়ে আক্রান্তদের দ্রুত আরোগ্যের জন্য আমরা প্রার্থনা করি। বিশ্বজোড়া এই চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে মানবতার লড়াইয়ে আমাদের শামিল হতে হবে।’
