হেফাজত নেতারা কী চান? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) মাহবুব আলম বলেন, ‘তারা আসলে চান বর্তমান সরকার পতনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে পাকিস্তান বা আফগানিস্তান মডেল বানানোর পরিকল্পনা আছে। সাম্প্রতিক নাশকতাও ছিল সরকারের পতনের জন্য।’
গতকাল শনিবার নিজের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাহবুব আলম বলেন, হেফাজতের মধ্যে বেশ কয়েকটি ভাগ আছে। একটি পক্ষ উগ্রবাদের পক্ষে যাদের নাম জানার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে গ্রেফতারও অব্যাহত আছে। উগ্রবাদের সঙ্গে জড়িতরা সম্প্রতি যে নাশকতা করেছে সেগুলোর ভিডিও ফুটেজ, অডিও কথোপকথন এবং জিজ্ঞাসাবাদে যে তথ্যগুলো এসেছে সেগুলোর মাধ্যমে সাক্ষ্য-প্রমাণের চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি নাশকতার বিরুদ্ধে হওয়া ১২টি মামলা এবং ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঘটনায় হওয়া ৫৩টিসহ মোট ৬৫টি মামলার তদন্ত করছে ডিবি। এখন পর্যন্ত সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের ১৪ জন নেতাকে ডিবি গ্রেফতার করেছে। তারা এখন ডিবির রিমান্ডে আছে। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য একসূত্রে গাঁথারও চেষ্টা চলছে বলে জানান মাহবুব।
নিজেদের নেতাকর্মীদের নিয়ে সারা দেশে ‘রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন’ নামক একটি সংগঠন তৈরি করেছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংগঠনটি সারা দেশে ওয়াজ মাহফিল নিয়ন্ত্রণ করছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আয়োজকদের বাধ্য করা হচ্ছে হেফাজত নেতাদের বিভিন্ন ওয়াজে নেওয়ার জন্য। এর মাধ্যমে তারা উগ্রবাদী বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে পারছে।’ তাছাড়া মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের ব্যবহার করে হেফাজত নেতারা বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। মাদ্রাসা দখলের মতো অপকর্ম ও অনেকে নারী বিলাসের মতো ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশে আগমনকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত হেফাজতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ১৪ জন নেতা গ্রেফতার হয়েছেন। মাহবুব আলম বলেন, ‘তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোরআন হাদিস বোঝেন, জানেন এমন তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনটি দল গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে মূলত নাশকতার মূল উদ্দেশ্য কী, কারা করছে, কেন করছে, তা জানার চেষ্টা করছেন তারা।’ ২০১৩ সালে সরকার পতনে অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হেফাজতের চক্রান্ত হয় উল্লেখ করে মাহবুব আলম বলেন, ‘হেফাজতকে কাজে লাগিয়ে সরকার পতনের একটি অপচেষ্টা চালিয়েছিল। এ বছর আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে যে নাশকতা হলো, সেখানে একই ধরনের আরেকটি চক্রান্ত হয়েছে। এটা তদন্তে অনেকটাই পরিষ্কার হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, হেফাজত নিজেদের অরাজনৈতিক দল বলছে। কিন্তু বাস্তব হলো তাদের অনেকেই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।’
তিনি বলেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাই মনে করেন যে, হেফাজত একমাত্র প্ল্যাটফরম যেটা ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে কাজে লাগতে পারে। মাদ্রাসার ছাত্রদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এমন ‘অপচেষ্টা’ করছে বা নাশকতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছেন। ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, অনেকেই তাদের অরাজনৈতিক চরিত্রটি বলছেন। কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে হেফাজত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এগুলো তাদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে পেয়েছি। ২০১৩ সালে বাবুনগরী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন। কিছুদিন আগে মুফতি ফখরুলও জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে এসব ষড়যন্ত্রের কথা এসেছে।
মাহবুব আলম বলেন, ‘প্রত্যেক রাজনৈতিক দলেরই আলাদা আলাদা এজেন্ডা রয়েছে। সেই এজেন্ডাগুলো তারা বাস্তবায়ন করতে চায় হেফাজতকে দিয়ে। হেফাজত এমনই এক সংগঠন যার ডাকে মাদ্রাসার ছাত্রদের আনা ও ব্যাপক লোক সমাগম সম্ভব হয়।’
কোনো রাজনৈতিক দল ষড়যন্ত্রে জড়িত কি না—এ বিষয়ে ডিবির যুগ্ম কমিশনার বলেন, ইসলামপন্থির বাইরেও মূলধারার রাজনৈতিক দল আছে। তাদের সঙ্গে জামায়াত ইসলাম ও বিএনপিরও বেশকিছু নেতার যোগসাজশ রয়েছে। ২০১৩ সালেও ছিল, চলতি বছরেও আছে। মাহবুব আলম বলেন, ‘লন্ডন থেকে ওলামা দলের এক নেতা হেফাজত নেতাদের পক্ষে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা তৈরি করছেন। হেফাজতের নেতাদের এখানে নাকি হিন্দু লোকজন জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। কোরআন নাকি ফেলে দেওয়া হয়েছে টয়লেটে। মামুনুল হককে নাকি মারধর করা হচ্ছে—ইত্যাদি অপপ্রচার হচ্ছে। এই মিথ্যা অপপ্রচার তাদের কৌশলেরই অংশ। দেশেও জামায়াত শিবিরের সঙ্গে জড়িত অনেকেই এটা করছেন যারা ইতিমধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন।’
সরকার পতনের বিষয়ে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কী চুক্তি হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তরে ডিবি যুগ্ম কমিশনার বলেন, ‘এ ধরনের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার হয়নি। তাদের সঙ্গে সর্বশেষ কোনো গোপন মিটিং হয়েছে, নাকি ২০১৩ সালের মিটিংয়ের ধারাবাহিকতায় তারা কাজ করছেন, সেগুলোর বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বীকার করেছেন, সবারই স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় এখানে রয়েছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারা দেশে যে নাশকতা হয়েছে এ বিষয়ে তারা বলছে, হেফাজত ছাড়াও আরো বহুলোক এখানে রয়েছে।’
হেফাজতের অর্থের জোগানদাতা কারা—এ বিষয়ে মাহবুব আলম বলেন, ‘হেফাজত নেতারা বলেছেন, বাইরে থেকেই বেশির ভাগ অর্থ আসে। রাজনৈতিক দল থেকে এ সময় কোনো ফান্ড নেওয়া হয়েছে কি না, এ ধরনের কোনো বিষয় এখনো পাওয়া যায়নি।’ এবার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাইরে থেকে অর্থ এসেছে কি না, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখনো নিশ্চিত নই। অভিযান অব্যাহত থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত নাশকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং ইন্ধনদাতারা গ্রেফতার না হচ্ছে।’
