চিকিত্সাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচাইতে দ্রুত সময়ের মধ্যে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হইয়াছে। একটি টিকা নহে, বেশ কয়েকটি কার্যকর টিকা সমগ্র বিশ্বকে আশার আলো দেখাইয়াছে; কিন্তু করোনা তো বসিয়া নাই। এই ভাইরাস যত অধিক মানুষের মধ্যে ছড়াইবে, তত অধিক সংখ্যায় ইহার নূতন নূতন ভ্যারিয়েন্ট বাহির হইবে। সেই সকল ভ্যারিয়েন্টের কোনো কোনোটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হইয়া উঠিতে পারে। এমনটিই ঘটিয়াছে করোনার নূতন ঢেউয়ে। ব্রাজিলে কয়েক দিন পূর্বে প্রতিদিন ৪ হাজারের উপরে মানুষ মারা যাইতেছিল। ইহার পূর্বে আমেরিকা ও ইউরোপের উপর দিয়া করোনার সুনামি বহিয়া গিয়াছে। এখন সেই সুনামি আছড়াইয়া পড়িয়াছে ভারতের উপরে। বাংলাদেশেও করোনার ছোবল মারাত্মক আকারে শুরু হইয়াছিল। সরকার ‘কঠোর লকডাউন’ দিয়াছিল। ‘কঠোর লকডাউন’ কঠোরভাবে না চলিলেও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ আপাতত একটুখানি ‘সহনশীল’ জায়গায় রহিয়াছে। তবে এই ভাইরাসটি এতটাই রহস্যময় যে, ইহাকে বাগে আনিবার সন্তুষ্টি অর্জন করা পৃথিবীর কোনো দেশের পক্ষেই সম্ভব নহে। ভাইরাসটির চরিত্র বিজ্ঞানীদেরও অনুধাবনের বাহিরে। এই জন্য, ইহার রোষানল হইতে রক্ষা পাইতে একমাত্র উপায় গণটিকাকরণ। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মতো আমরাও সেই গণটিকাকরণের পথেই আগাইতেছিলাম।
এই বত্সর ৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট হইতে উত্পাদিত অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা দেওয়ার মধ্য দিয়া আমাদের গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। বলা যায়, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান কর্মসূচি এখন অবধি দেশের স্বাস্থ্য খাতের সবচাইতে সুষ্ঠু কার্যক্রম; কিন্তু ভারতে অপ্রত্যাশিতভাবে হঠাত্ই করোনার প্রবল সুনামি শুরু হওয়ায় নূতন বিপদ দেখা দেয়। এমতাবস্থায়ক ভারত আগামী ১ মে হইতে ১৮ বেসর উপরে দেশটির সকল নাগরিককে গণটিকাকরণের কর্মসূচি গ্রহণ করিয়াছে। এইদিকে ভারত আপাতত টিকা রপ্তানি বন্ধ রাখিয়াছে। আর তাহাতেই বাংলাদেশের টিকার প্রাপ্তি লইয়া দেখা দিয়াছে গভীর অনিশ্চয়তা। চুক্তি অনুযায়ী ৩ কোটি ডোজ টিকার মধ্যে এখন পর্যন্ত দুই দফা চালানে ৭০ লক্ষ ডোজ টিকা পাইয়াছে বাংলাদেশ। ইহা ছাড়া, ভারত সরকারের পক্ষ হইতে বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেওয়া হইয়াছে সর্বমোট ৩৩ লক্ষ ডোজ টিকা। অর্থাত্ বাংলাদেশ এখন অবধি মোট ১ কোটি ৩ লক্ষ ডোজ টিকা পাইয়াছে। সরকার অবশ্য গতকাল আশাবাদ ব্যক্ত করিয়াছে যে, আগামী মাসের শুরুতে ২১ লক্ষ টিকা পাওয়া যাইবে; কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী আরো বিপুলসংখ্যক টিকা কবে পাওয়া যাইবে, তাহা নিশ্চিত নহে। এমতাবস্থায় অনেকেই মনে করিতেছেন, ভারত অযৌক্তিকভাবে ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত লইয়াছে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নহে। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার যেই ভ্যাকসিন তৈরি হইতেছে তাহার কাঁচামালের একটা বড় অংশ আসিয়া থাকে যুক্তরাষ্ট্র হইতে। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের খারাপ করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় আনিয়া (যাহাকে তাহারা জাতীয় সংকট বলিতেছে) প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ‘দ্য ডিফেন্স প্রটেকশন অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর ক্ষমতাবলে করোনা ভ্যাকসিনের কাঁচামাল রপ্তানি বন্ধ করিয়াছেন। ফলে সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার ভ্যাকসিন উত্পাদন অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়িয়াছে। এই কারণেই ভারত সরকারও সিরাম ইনস্টিটিউটের উপর ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করিতে বাধ্য হইয়াছে।
ভারত আমাদের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র। তাহাদের জনসংখ্যা বিপুল, টিকার চাহিদাও বিপুল। সেই তুলনায় আমাদের চাহিদা সামান্যই বলা যায়। সুতরাং পর্যায়ক্রমে ইহা আমাদের প্রদান করিবার বিষয়টি ভারত নিশ্চয়ই গুরুত্বের সহিত বিবেচনা করিবে। ইহা ঝগড়াঝাঁটির কিংবা নিয়মনীতি দেখাইবারও বিষয় নহে। মনে রাখিতে হইবে, শুধু বাংলাদেশ নহে, ইউরোপের বহু দেশেও অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন বন্ধ রহিয়াছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও সিরাম ইনস্টিটিউটের নিকট হইতে ২ বিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন ক্রয় করিয়া দরিদ্র দেশগুলির মধ্যে দেওয়ার কথা। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এই পর্যন্ত পাইয়াছে মাত্র ৩০ মিলিয়ন ডোজ। সব মিলাইয়া বিশেষজ্ঞগণ বলিতেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোভিড ভ্যাকসিনের কাঁচামাল রপ্তানির ওপর হইতে নিষেধাজ্ঞা না তোলে, তাহা হইলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বিরাট ঝুঁকির মুখে পড়িবে। সুতরাং আমাদের আপাতত ধৈর্য ধারণ করিতেই হইবে। যতদিন অবধি টিকা প্রাপ্তি ও জোরদার গতিতে পুনরায় টিকাকরণ শুরু না হইতেছে, ততদিন অবধি নিষ্ঠার সহিত স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিতে হইবে।
