মাগুরার খামারপাড়া গ্রামের এক ঘন সবুজ বাগানের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল জামরুলগাছের ডালে বসে চুপটি মেরে দোল খাচ্ছে হলুদ রঙের একটা পাখি। দিনের আলোয় সেই পাখির সোনালি-হলুদ রং এবং গোলাপি ঠোঁট আমার চোখ জুড়িয়ে দিয়েছিল। গাছের ডালে দুলে দুলে সামান্য বিরতি দিয়ে উড়ে উড়ে পোকা খাচ্ছিল পাখিটি। ছবির মতো এমন দৃশ্য তৈরি করা পাখি গ্রামের মানুষের কাছে ‘হলদেপাখি’, ‘কুটুমপাখি’, ‘ইষ্টিকুটুম’, ‘সোনাবউ’ ও ‘বেনেবউ’ নামে পরিচিত। প্রবাদ আছে—যে বাড়িতে এই পাখি এসে বসে সেই বাড়িতে কুটুম আসা নিশ্চিত। তাই অনেকে একে কুটুম বা ইষ্টি কুটুম পাখি বলে ডাকে। বাংলাদেশের বেশ কিছু পাখির গায়ের রং হলুদ; তবে হলুদ রঙের সব পাখিকেই হলুদ পাখি বলা যাবে না।
হলুদ পাখির মাথা, গলা, ঊর্ধ্ব-বক্ষ, ডানা ও পুচ্ছে কালো রংসহ দেহের অবশিষ্ট অংশ উজ্জ্বল সোনালি হলুদ রঙের। ঠোঁট গোলাপি, চোখ গাঢ় লাল ও পায়ের রং খানিকটা নীলচে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম, তবে স্ত্রী পাখির মাথার কালো রং অপেক্ষাকৃত ফ্যাকাসে, পিঠের দিকে হলদে-সবুজ ও দেহের নিচের দিকে ডোরা, চোখ বাদামি-গাঢ় লাল। তরুণ পাখির অপেক্ষাকৃত অনুজ্জ্বল পিঠ ও দেহতলে মোটা ডোরা আছে। উচ্চতা সাধারণত ২৫ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬৫ গ্রাম। এই পাখি কর্কশ স্বরে ‘চীয়া’ বা ‘কোয়াক’ বোল তুলে ডাকে এবং ‘পীলোলো’ শব্দে শিস দেয়। শীত মৌসুমে নীরব থাকে, কিন্তু গ্রীষ্মে কর্কশ গলায় ডাকাডাকি করে। এরা একা বা জোড়ায় থাকতে পছন্দ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে রসাল ফল, ফুলের মধু ও পোকা। এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ৬ থেকে ১২ মিটার উঁচুতে লম্বা ডালের প্রান্তে ঘাস ও আঁশ দিয়ে বাটির মতো গভীর বাসা বানিয়ে এরা দুই থেকে চারটি সাদা ডিম পাড়ে। বাসার সব কাজে স্ত্রী ও পুরুষ উভয়ে অংশ নেয়।
হলুদ পাখি বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়। ভারত, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, কম্বোডিয়া, লাওস ও ভিয়েতনামেও দেখা মেলে এদের। সারা পৃথিবীতে ২৭ প্রজাতির হলুদ পাখি বা বেনেবউ বা সোনাবউ আছে। বাংলাদেশে পাঁচ প্রজাতির হলুদ বা কুটুম পাখি পাওয়া যায়। এদের মধ্যে চারটি জাত মেরুন রঙের। এরা হলো কালোঘাড় বেনেবউ, সরুঠোঁট বেনেবউ, কালোমাথা বেনেবউ, তামারং বেনেবউ এবং ইউরেশীয় সোনাবউ। এদের মধ্যে তামারং বেনেবউ পাখির দেহে হলুদ রং নেই। তবে এদের মাঝে কালোমাথা বেনেবউ বাংলাদেশের গ্রাম অঞ্চলে বেশি পাওয়া যায়।
গত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা বাড়ছে না কমছে সে ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানা যায়নি; তবে এরা এখনো একদম আশঙ্কাজনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেনি। সে কারণে আইইউসিএন এই প্রজাতিটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে প্রজাতিটিকে এখনো সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়নি। তবে গ্রামে আগের মতো হলুদ পাখি তেমন চোখে পড়ে না।
