ইহা কোন ধরনের মানসিকতা?

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৪

এ কোন পৃথিবীতে আমরা বসবাস করিতেছি? সামান্য স্বার্থের কারণে আপনজনকে নিজ হাতে খুন করিতেও আমরা পিছপা হইতেছি না! কেয়ামতের দিন কেহ কাহাকে চিনিবে না। সকলেই নিজের ভবিষ্যত্ ও পরিণাম লইয়াই চিন্তা করিতে থাকিবে। সাম্প্রতিক কিছু নিষ্ঠুর ও নির্মম হত্যাকাণ্ড দেখিয়া মনে হইতে পারে—সেই সময় বুঝি এখন আসিয়া গিয়াছে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ১০ মাস পূর্বে ৭৫ বত্সরের এক ব্যক্তিকে খুনের ঘটনায় গত বরিবার পুলিশ এক নূতন তথ্য দিয়াছে। তাহাতে দেখা যায়, জলমহালের ইজারা লইয়া দুই পক্ষের সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হন ঐ বৃদ্ধ। দীর্ঘ তদন্তের পর এখন পুলিশ বলিতেছে, প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে ঐ ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছে তাহারই এক ছেলেসহ স্বজনেরা। প্রতিপক্ষকে ফাঁসাইতে শুধু নিজ পিতা নহে, নিজ পুত্রকে হত্যা করিবারও নজির রহিয়াছে এই দেশে। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠে, ইহা কোন ধরনের মানসিকতা?

মানুষের আস্থা, প্রেম-ভালোবাসা ও নির্ভরশীলতার বড় জায়গা হইল পরিবার। সেই পরিবারেই যখন কেহ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন এমনকি খুনখারাবির শিকার হন, তখন ইহার চাইতে দুঃখজনক ঘটনা আর কী-বা হইতে পারে? আমরা আমাদের সমাজে এমন কিছু ঘটনা ঘটিতে দেখি, যাহা দেখিয়া শিহরিত হইয়া উঠি। কাঁপিয়া উঠে অন্তর। এক প্রেমিকার দাবি ছিল বিবাহ করিতে হইলে সরকারি চাকুরি করিতে হইবে। ছেলেটি একটি সরকারি চাকুরি পাইতে অনেক চেষ্টা-তদবির করে; কিন্তু একসময় ব্যর্থ হইয়া পোস্ট অফিসে চাকুরিরত বাবাকে হত্যা করে। তাহার ধারণা ছিল বাবাকে হত্যা করিলে ক্ষতিপূরণ হিসাবে বাবার পোস্ট অফিসের চাকুরিটি পাওয়া যাইবে। মানুষ কতটা নিচে নামিতে পারে—ইহা হইল তাহার একটি দৃষ্টান্ত। আবার ফেনীর ছাগলনাইয়াতে মায়ের জন্য মুখোশ পরিয়া বাবাকে খুন করিবার ঘটনাও ঘটিয়াছে। মা-বাবার মধ্যে প্রায়শই ঝগড়া হইত। ইহারই জেরে মায়ের পক্ষাবলম্বন করিয়া বাবাকে বন্ধুরা মিলিয়া হত্যা করে। এমনকি মা ও ছোট ভাইবোনদের সহিত বাবা দুর্ব্যবহার করেন। তাহার জের ধরিয়াও বন্ধুরা মিলিয়া বাবাকে খুন করিবার ঘটনা ঘটিয়াছে এই দেশে। শুধু ঝগড়া বা দুর্ব্যবহার নহে, টাকা দিতে না চাওয়ায় বা নূতন বিবাহ করিতে চাওয়ায় পিতাকে হত্যা করা হইয়াছে। আবার মাদকাসক্ত ছেলেমেয়ের হাতে বাবা-মা খুনের ঘটনাও বিরল নহে।

পারিবারিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের পিছনে আইনের শাসনের অভাব যতটা দায়ী, তাহার চাইতে অধিক দায়ী সামাজিক অস্থিরতা। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মাদকাসক্তি ইত্যাদি কারণে অনেক সময় বিভিন্ন লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়া থাকে। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির সময় সামাজিক অস্থিরতা দিনদিন বাড়িতেছে। পরিবারে দেখা দিতেছে বিবাদ বা ভাঙন। সংসারে যখন অভাবের অজগর দেখা দেয়, তখন প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মায়াতেও টান পড়ে। ইহার কিছু চিত্র সিনেমা-নাটকে দেখা যায়। দেখা যায়, দজ্জাল বউয়ের কারণেও অনেকে বাবা-মাকে দেখিতে পারে না। এই করোনা দুর্যোগকালে বয়স্ক বাবা-মাকে পথেঘাটে বা জঙ্গলে ফেলিয়া আসিবার ঘটনাও ঘটিয়াছে। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় মূল্যবোধের কারণে পরিবারগুলিতে যে শান্তি, সম্মান, স্বস্তি বিরাজমান, তাহার আগল ক্রমেই খুলিয়া যাইতেছে। পরিবারের বাহিরে বন্ধুবান্ধব মহলেও পূর্বের মতো প্রীতিকর সম্পর্ক পরিলক্ষিত হইতেছে না। গতকালই ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবরে বলা হইয়াছে, ঢাকার সাভারে মাত্র ২০০ টাকার জন্য এক ট্রাকচালককে গলা কাটিয়া হত্যার অভিযোগ উঠিয়াছে তাহারই এক ভ্যানচালক বন্ধুর বিরুদ্ধে। ইহা কীসের আলামত? বলা যায়, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যেও মানুষের অপরাধপ্রবণতা কমে নাই, বরং বাড়িয়া চলিয়াছে উদ্বেগজনকভাবে। একশ্রেণির মানুষ পুলিশ প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ—কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করিতেছে না। শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নহে, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের প্রসার ও সচেতনতার মাধ্যমে এই সকল নৃশংস অপরাধকাণ্ডের লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে।