বিপজ্জনক আয়বৈষম্যে অনেক বিপদ

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২১, ২২:২৫

করোনা মহামারির মধ্যে গত বছর ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই বাজেট ছিল অন্যান্য বছরের থেকে ব্যতিক্রম। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য মূলত ঐ বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছিল। বাজেটের আকার ছিল ৫.৬৮ ট্রিলিয়ন টাকা, যা মোট জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এ বাজেটের ঘাটতি। প্রায় ৮.২ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট তৈরি করা হয়েছিল। বাজেটের পাশাপাশি করোনার প্রথম ঢেউ থেকে এদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য সরকার মোট ২৩টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, যা মোট জিডিপির ৪.৪ শতাংশ। এর বাইরে সরকারের পক্ষ থেকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময়েও নগদ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

অনেকেই মনে করেন, করোনাকেন্দ্রিক বাজেট ও প্রণোদনা প্যাকেজ অর্থনীতিতে তেমন সুফল বয়ে আনেনি। সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত খবর পড়ে এর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারি। এছাড়া, বাজেট বাস্তবায়নের হার এতটা সন্তোষজনক নয়। বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে বার্ষিক বাজেটে গড়ে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা করে বেড়েছে। কিন্তু বাজেট বাস্তবায়নের হার কমতে কমতে ৮০ শতাংশের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। করোনার প্রভাবে ছয় মাসে বাস্তবায়ন কমেছে ১১ শতাংশ। গত বছর করোনার প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করে। এর সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রবাসী শ্রমিকেরা কাজ হারাতে শুরু করেন। বেসরকারি এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, প্রায় শূন্য.৪ মিলিয়ন প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। সম্প্রতি পোশাকশিল্প খাতের চারটি সংগঠন বলেছে, করোনা মহামারির কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আদেশ হারিয়েছে পোশাক খাত। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় রপ্তানি হারিয়েছে ৯.৫ শতাংশ। ২০২০ সালের এপ্রিল নাগাদ পোশাক খাতের ১ হাজার ১৫০টি সদস্য প্রতিষ্ঠান ৩১৮ কোটি ডলারের কার্যাদেশ বাতিল ও স্থগিতের শিকার হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে এই শিল্পে কর্মরত ৪০ লাখের বেশি শ্রমিকের ওপর। রাতারাতি কাজ হারিয়েছেন এবং নিয়মিত বেতনও পাননি অনেকে। দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকল বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের হার। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৯ সালে বিশ্বে যত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, তার চেয়ে ৩৩ মিলিয়ন বেশি কর্মী ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে চাকরি হারিয়েছেন। বাংলাদেশেও এটা দেখা গেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিআইএলএস) ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৩ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, দেশে ১৬.৩৮ মিলিয়ন মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে। করোনার প্রভাবে ৩৭ শতাংশ মজুরি হ্রাস পেয়েছে—প্রতিবেদন অনুযায়ী। বেসরকারি সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জরিপের তথ্য বলেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর আগে এ বছরের মার্চে নতুন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৪৫ লাখ। এছাড়া এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী সময়ে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাবে, তখন ইউরোপিয়ান বাজারে প্রায় ১৪.৭ শতাংশ রপ্তানি কমে যাবে, যার ফলে নতুন গরিবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ২৫ হাজার ১৬৮। অর্থাত্, দারিদ্র্যের সংখ্যা হবে ২৪.০৯ মিলিয়ন থেকে ২৪.১৬ মিলিয়ন। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, করোনা ভাইরাসের প্রথম ধাক্কায় দেশের ৬৫.৭১ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দেশের ৩৭.১৪ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন উত্স থেকে ঋণ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। সুতরাং, ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট নিম্ন আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে প্রণয়ন করতে হবে। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশ শ্রমজীবীর কথা মনে রেখে এবারের বাজেট প্রণয়ন যুক্তিযুক্ত হবে। কর্মহীন ও নতুন গরিব হয়ে পড়া বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাজেটের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি—কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা), সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আগের অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ছিল। এবারের বাজেটে এই হার ২৫ শতাংশের ওপরে থাকা উচিত। কর্মহীন ও প্রবাসফেরত মানুষের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ প্রদানের জন্য বাজেটে বরাদ্দ ছিল। এই বরাদ্দ আরো বাড়াতে হবে। লকডাউনের মধ্যে নগদ সহায়তার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ স্বল্প মেয়াদে উপকৃত হবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সুপরিকল্পিত বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। করোনা মহামারির কারণে এখন দেশে দারিদ্র্যের হার ৪২ শতাংশ—সানেমর গবেষণা অনুযায়ী। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। এই দ্বিতীয় ঢেউ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সরকার ইতিমধ্যে টানা ১৪ দিনের লকডাউন দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আরো বেশি ভয়ংকর হবে। এর ধাক্কায় শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারাবে, নতুন করে আবার গরিব মানুষের সংখ্যা বাড়বে, বেকারত্বের হার বাড়বে এবং সঙ্গে দারিদ্র্যের হার বাড়বে। কর্মবাজার সংকুচিত হয়েছে, সামনে আরো হবে। নিম্ন আয়ের মানুষ এখন নিঃস্ব, সর্বস্বহারা, হতাশাগ্রস্ত, ভাগ্যনির্ভর। এসব মানুষকে সরকারি উদ্যোগে ১৯২৯-৩৩-এর মহামন্দার সময়ে নিউডিল কর্মসূচির মতো ব্যাপক ও শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই।

আরো উল্লেখ্য যে, করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে আয়বৈষম্য ও সম্পদবৈষম্য অতি দ্রুত বেড়ে গেছে। আমাদের দেশে আয়বৈষম্যের মাপকাঠি গিনি সহগের মান লকডাউনের আগে ছিল ০.৪৮২, যা লকডাউনের পরে মাত্র ৬৬ দিনের মধ্যেই (৩১ মে ২০২০ নাগাদ) বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৬৩৫-এ। আর পালমা অনুপাত (যা দেখায় একটি দেশের সর্বোচ্চ আয়ের মালিক ১০ শতাংশ মানুষের মোট আয় সর্বনিম্ন আয়ের মালিক ৪০ শতাংশ মানুষের মোট আয়ের কত গুণ বেশি) একই সময়ে ২.৯২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭.৫৩, যা বিপত্সীমার দ্বিগুণের বেশি। সুতরাং করোনা ভাইরাস বাংলাদেশকে উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশ এবং বিপজ্জনক আয়বৈষম্যের দেশে রূপান্তরিত করে ছেড়েছে।

বহুজাতিক আর্থিক পরামর্শদানকারী প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ এক্স গত বছর জানিয়েছেন, সম্পদশালীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ধনকুবেরের (৫০ লাখ ডলারের বেশি সম্পদের অধিকারী) সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৪.৩ শতাংশ হারে। এ ধারা চলতে থাকলে বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনের দিকে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে যাবে। এমতাবস্থায় বাজেট প্রণেতাদের উদ্দেশে বলতে চাই, এবারের বাজেট কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দারিদ্র্যের হার এবং বিপজ্জনক আয়বৈষম্য কীভাবে কমানো যায় সেদিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে।

n লেখক :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক