হাসপাতালের মর্গের বাইরে রাখা অ্যাম্বুলেন্স। তাতে কোভিডে মৃতদের দেহ চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সত্কারের জন্য। জায়গা নেই, তবু গাদাগাদি করেই একটি অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে ২২টি দেহ। একটির ওপর একাধিক বস্তাবন্দি দেহ চাপানো রয়েছে সেই গাড়িতে। এই ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে ভারতের মহারাষ্ট্রের বীড জেলার অম্বেজোগাইয়ে। আর দিল্লির রাস্তায় মৃতদেহের সারি লক্ষ করা যাচ্ছে, যেগুলো সত্কারের জন্য রাখা হয়েছে। এ দুটি দৃশ্যই ভারত করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় কতটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে তা দেখিয়ে দিচ্ছে। দেশটিতে গতকাল মৃতের সংখ্যা ২ লাখের কাছে পৌঁছেছে। নতুন সংক্রমণও ৩ লাখের বেশি। এরই মধ্যে দেশটিতে শতাধিক মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তা আক্রান্ত এবং দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। খবর বিবিসি, ডেইলি মেইল ও আনন্দবাজার পত্রিকার
দিল্লিতে মৃতদেহের সারি, অস্থায়ী শ্মশান :কোভিডে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষের মৃত্যুতে ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন এক আতঙ্কের নগরী। গত সোমবারও দিল্লিতে সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৮০। শহরের হাসপাতালগুলোতে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিইউ বেড সব ভর্তি। চরম সংকট চলছে অক্সিজেন ও প্রাণরক্ষাকারী ওষুধের। এর মধ্যে দেশ জুড়ে ধাই ধাই করে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ভারতে নতুন কোভিড সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার ১৪৪। এর আগের দিন ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার ৯৯১। আর মৃতের সংখ্যা বেড়েছে ২ হাজার ৭৭১ এবং মোট মারা গেছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৪ জন। যদিও ধারণা করা হচ্ছে, প্রকৃত সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। হাসপাতালে চিকিত্সাসেবায় সামরিক চিকিত্সকদের নিয়ে আসা হয়েছে।
অনেক শহরে শ্মশানগুলো শব দাহ করার নজিরবিহীন চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শ্মশানকর্মীদের দিনরাত কাজ করতে হচ্ছে। দাহ করার জন্য কাঠের জোগাড়, সেগুলো সাজানোর ভার মৃতের স্বজনদের ঘাড়ে এসে পড়ছে। রাজধানী দিল্লির অবস্থা এতটাই সঙ্গিন যে খোলা মাঠ, পার্ক এমনকি গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায়ও অস্থায়ী শ্মশান তৈরির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কারণ যেসব সরকারি শ্মশান দিল্লিতে রয়েছে তারা আর চাপ নিতে পারছে না।
মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে দাহ করার জন্য তীব্র গরম আর চিতার আগুনের হলকার মধ্যে পিপিইতে মোড়া স্বজনদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দিল্লির সারাই কালে খান শ্মশানের ভেতরে খালি জায়গায় গত কদিনে নতুন ২৭টি দাহ করার বেদি তৈরি করা হয়েছে। শ্মশানটির লাগোয়া পার্কে আরো ৮০টি বেদি তৈরি হয়েছে। যমুনা নদীর তীরঘেঁষা এলাকাগুলোতে অস্থায়ী শ্মশান তৈরির জন্য জায়গা খুঁজছে দিল্লি পৌর কর্তৃপক্ষ।
মৃতের সংখ্যা ধামাচাপার অভিযোগ
বিস্তর অভিযোগ উঠেছে যে, সরকার কোভিডে মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করছে। ভারত ও ভারতের বাইরে নির্ভরযোগ্য বহু পত্রপত্রিকায় মৃতের সংখ্যা ধামাচাপা দেওয়ার কথা প্রমাণসহ প্রকাশ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, ভোপাল শহরে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে ১৩ দিনে কোভিডে মৃত্যুর সরকারি সংখ্যা মাত্র ৪১ হলেও তাদের এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঐ একই সময়ে ভোপালে ১ হাজারেরও বেশি লোকের মৃত্যু হয়েছে।
শহরের চিকিত্সক ডা. জিসি গৌতমকে উদ্ধৃত করে নিউ ইয়র্ক টাইমস বলেছে, অনেক মৃত্যু সরকারি রেকর্ডে তোলা হচ্ছে না। সরকার চাইছে না জনমনে ভীতি তৈরি হোক। গুজরাটের অন্যতম শীর্ষ দৈনিক সন্দেশ তাদের সংবাদদাতাদের রাজ্যের বিভিন্ন শ্মশান ও গোরস্তানে পাঠিয়ে দেখেছে সরকার মৃত্যুর যে সংখ্যা দিচ্ছে, প্রকৃত মৃত্যু তার কয়েক গুণ বেশি। পত্রিকাটি লিখছে, গুজরাটে প্রতিদিন গড়ে ৬১০ জন মারা যাচ্ছে। একই অভিযোগ আসছে উত্তর প্রদেশ এবং দিল্লির বেলায়ও। এক অনুসন্ধানে ভারতের টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনডিটিভি দেখতে পেয়েছে, গত সপ্তাহে দিল্লিতে সরকারের দেওয়া হিসাবের চেয়ে ১ হাজার ১৫০ জন বেশি রোগী মারা গেছে। দেশ জুড়ে এমন অনেক অনুসন্ধানে মৃত্যু গোপন করার একই ধরনের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
শতাধিক মার্কিন কূটনীতিক আক্রান্ত
মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্ক সিএনএন জানিয়েছে, ভারতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুজন কূটনীতিক মারা গেছেন এবং শতাধিক কূটনীতিক ও কর্মকর্তা আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের বেশির ভাগই দূতাবাস ও কনস্যুলেটে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা। তবে কোন কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা আক্রান্ত এবং মারা গেছেন, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি সিএনএন। ইউএস সার্জন জেনারেল ড. বিবেক মুর্থি জানিয়েছেন, ভারতে তার কয়েক জন আত্মীয় করোনায় মারা গেছেন।
আসছে বিদেশি সহায়তা
ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে প্রথম আন্তর্জাতিক সহায়তা হিসেবে ভারতে পৌঁছেছে যুক্তরাজ্য থেকে ভেন্টিলেটর ও অক্সিজেনসামগ্রী। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানিও সহায়তা হিসেবে অতিপ্রয়োজনীয় চিকিত্সাসামগ্রী পাঠাচ্ছে। যুক্তরাজ্যের পাঠানো ভেন্টিলেটর ও তরল অক্সিজেন দিল্লি বিমানবন্দর থেকে খালাস করা শুরু হয়েছে। এসব সামগ্রী হাসপাতালগুলোর সংকট কিছুটা হলেও কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচি বলেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাজ করতে শুরু করেছে। কিন্তু সংকট কাটিয়ে উঠতে এ ধরনের আরো প্রচুর সরবরাহ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি
