আব্দুর রহমান, আশুগঞ্জ থেকে ফিরে
ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী সুমী আক্তার। গত বছর মার্চে আশুগঞ্জের লাউয়াসারে গিয়েছিলো পরিবারের সাথে দেখা করতে। কিন্তু এরপরেই করোনার কারণে লকডাউন শুরু হয়ে যাওয়ায় আর ঢাকা ফেরা হয়নি। কয়েক মাস পর শুরু হয় অনলাইন ক্লাস। সুমি পড়ে যায় বিপদে।
সুমী জানায়— ‘মোবাইল ইন্টারনেটে অনলাইন ক্লাস করার কথা চিন্তাই করা যায় না। আমাদের বাড়িতে স্পিড ভালো না, খরচও অনেক বেশি। দুই দিন ক্লাস করে আমার সব ডাটা শেষ হয়ে গেছিল। আমার মনে আছে ২ দিনে আমার খরচ হয়েছিল ১০০ টাকার উপরে। এতো টাকা খরচ করে অনলাইনে ক্লাস করা কোনো ভাবেই সম্ভব না। খোঁজ পেলাম কার্নিভাল ইন্টারনেটের। আমাদের বাড়ির চার পাশের কয়েকটা বাড়ি মিলে আমরা একসাথে নিলাম এই সুবিধা। উঠানের মাঝে কার্নিভাল নামক ইন্টারনেট কোম্পানিটি একটি রাউটার বসিয়ে দেয়। কয়েক বাড়ির প্রতিবেশীরা মিলে আমরা এখন ইন্টারনেট ব্যবহার করি। বাড়ির কাছের দোকান এখন কার্নিভাল হাটের ব্যবসায়ী। সেই দোকান থেকে ওয়াইফাই কার্ড কিনে খুব সহজেই আমাদের এই রাউটার দিয়ে ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। স্পিড খুব ভালো, কোনো ধরণের ডেটা লিমিটেশন নাই, এখন আর চিন্তা করে অনলাইন ক্লাস করতে হয় না। সত্যিকার ইন্টারনেট বলতে যা বোঝায় আমরা ঠিক তাই পাই। ঢাকায় যখন পড়তে গেলাম, তখন সেখানে তো আমার হলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট ছিল। বেশ আরামেই অনলাইনে কোর্স করতাম, ইউটিউব দেখতাম, দেখে দেখে শিখতাম। স্পিড আর লিমিট নিয়ে ভাবতে হত না। কিন্তু লাউয়াসারেতো আগে ব্রডব্যান্ডই ছিলনা। এখনতো গ্রামে বসেই ঢাকার সব সুবিধা পাচ্ছি।’
ফাইবার ব্রডব্যান্ড ব্যবহার করে একটি রাউটার সেটআপ দিয়ে একসাথে কয়েকটা বাসাকে ইন্টারনেট কাভারেজে আনার এই পন্থা খুবই অনন্য একটি উদ্ভাবন। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এই উদ্ভাবনের মাধ্যমে যেভাবে উপকৃত হচ্ছে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এই উদ্যোগের ব্যাপারে জানতে আমরা কথা বলেছিলাম কার্নিভাল ইন্টারনেটের পরিচালক জামান খানের সাথে, যার হাত ধরে কার্নিভাল ইন্টারনেট যাত্রা শুরু করে আজ সারাদেশে বিস্তৃতি লাভ করেছে।
জামান খান জানান, দেশব্যাপী শক্তিশালী ফাইবার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পৌঁছে দেয়ায় স্বপ্নে বিভোর হয়ে ২০১৫ সালে ডোজ ইন্টারনেট নামে যাত্রা শুরু করেছিলাম আমরা। ২০১৮ সালে কার্নিভাল ইন্টারনেট নাম ধারণ করে আমরা নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ি সেই স্বপ্ন সত্যি করার লক্ষ্যে। এরপর আমাদের নিরন্তর ছুটে চলা শহর থেকে বন্দরে, গ্রাম থেকে গ্রামে। তারুণ্যের আবেগে আমরা দাপিয়ে বেড়িয়েছি দেশের প্রতিটি কোনা-টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া!
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এবং ‘রূপকল্প ২০২১’ এর অনুপ্রেরণা থেকেই এশিয়ার সর্ববৃহত্ গ্রাম ‘বানিয়াচং’ থেকে ‘কার্নিভাল গো রুরাল’ প্রজেক্ট শুরু করেছিলাম আমরা।
কার্নিভাল ওয়াইফাই হাট নিয়ে আমরা পৌঁছে যাওয়ার চেষ্টা করেছি প্রান্তিক পর্যায়ের ইন্টারনেট সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে। সেই যাত্রার ধারাবাহিকতায় আমাদের সাথে যোগ দিয়েছে ১ লাখেরও বেশী গ্রাহক পরিবার এবং ৫ লাখেরও বেশী ওয়াইফাই হাট গ্রাহক।
জামান খান আরও জানান, বৈশ্বিক মহামারির কারণে শিক্ষা ব্যাবস্থায় একটা আমূল পরিবর্তন এসেছে। অনলাইন শিক্ষার জন্য প্রয়োজন সঠিক স্পীডের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এবং সেটা হতে হবে সাশ্রয়ী। মোবাইল ইন্টারনেটের কারণে আমরা ইন্টারনেটের সাথে পরিচিত হতে পারলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের গতি, লিমিটেড ডাটা ও উচ্চ মূল্য অনলাইন শিক্ষার জন্য সহায়ক নয়। কার্নিভাল বিশ্বাস করে শিক্ষার জন্য সত্যিকার অর্থে ফাইবার ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সাশ্রয়ী দামে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে লক্ষ্যেই ৪৮ জেলার ১৮২ উপজেলার সাড়ে ১১ হাজার গ্রামে আমরা পৌঁছে গেছি। শহর ও গ্রামের ডিজিটাল বিভেদ নিরসনে আমাদের এই উদ্যোগে উপকৃত হচ্ছে শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য মানুষ! পাশাপাশি কার্নিভাল ইন্টারনেট একটি এডুকেশনাল প্লাটফর্মের মাধ্যমে ঢাকা ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ভাল মানের শিক্ষাকে গ্রামের সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের নিকট পৌঁছে দেয়ার কাজ শুরু করেছে। এই প্লাটফর্মটি ‘মাইন্ড কারেন্ট’ নামে পরিচিত। আমরা আশা করছি, মাইন্ড কারেন্ট গ্রাম আর শহরের শিক্ষা ও শিক্ষার মানের ব্যবধান ঘুচাবে।
