ইত্তেফাক ডেস্ক
খরার কবলে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। অনাবৃষ্টি ও তীব্র দাবদাহে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। খরা দীর্ঘায়িত হলে কৃষি খাতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
পিরোজপুর:গত ছয়-সাত মাস ধরে পিরোজপুর জেলায় বৃষ্টি হচ্ছে না। নজিরবিহীন খরায় পুড়ছে পিরোজপুর অঞ্চল। তীব্র দাবদাহে কৃষি খাতে এরই মধ্যে জেলা জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খরার কারণে বর্তমানে মাঠে থাকা বোরো ধান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পুষ্ট হয়নি। এছাড়া কিছু ধান চিটা হয়েছে। উপরন্তু জেলায় আউশ ধানের চাষ বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় আউশ বীজতলা স্থাপনে বিলম্ব হয়েছে এবং এখন খরার কারণে আউশ ধান রোপণকাল পিছিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি খেতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। এদিকে খরায় আম, মাল্টা ও পেয়ারাচাষিদের মাথায় হাত উঠেছে। পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারায় ইতিমধ্যে আম ও মাল্টা ফসলের গুটি ঝরে পড়ছে এবং জেলায় অন্যতম প্রধান অর্থকারী ফসল পেয়ারার ফুল শুকিয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির কোনো বিকল্প দেখছে না কৃষক। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ চিণ্ময় রায় বলেন, ‘গত ছয় মাস পিরোজপুর অঞ্চলে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। গত তিন দিনে তাপমাত্রা ৪১ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করেছে। যার প্রভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।’ এদিকে, নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা বিলের সবজিকৃষক আকতার হোসেন জানান, বৃষ্টির অভাবে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। নেছারাবাদ উপজেলার জলাবাড়ী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা অঞ্জু রাণী হালদার খরায় তার এলাকার শাকসবজি আবাদ রক্ষায় চাষিদের প্রাণান্তকর চেষ্টার কথা জানিয়ে বলেন, ‘জোয়ারের পানি ও ছোট পাম্প দিয়ে কৃষকরা সেচ দিচ্ছেন।’ পিরোজপুরের বিশিষ্ট কৃষি লেখক জগত্ প্রিয় দাস বিশু বলেন, ‘দাবদাহ থেকে ফসল রক্ষার জন্য স্থানীয় উত্স থেকে সেচ এবং মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করলে খরা ও লবণাক্ততা দুইই সামাল দেওয়া সম্ভব।’
দিনাজপুর : তীব্র রোদে পুড়ছে দিনাজপুরসহ আশপাশের এলাকা। একদিকে করোনা পরিস্থিতি আর অন্যদিকে এই দাবদাহে জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে দিন মজুরসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষের। দিনাজপুর আঞ্চলিক আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জল হোসেন জানান, মঙ্গলবার দিনাজপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য বেশি না থাকায় এই তাপমাত্রা তীব্র অনুভূত হচ্ছে। এবার চলতি মার্চ মাসে বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ২২ মিলিমিটার। চলতি বছর বৃষ্টিপাতের অভাবেই তাপমাত্রা বেড়েছে। দেখা গেছে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোচালকসহ পথচারীর সংখ্যা কমে যায়। বড় সড়কগুলোতে লোকজনের চলাচলও সীমিত হয়ে যায়। গত মঙ্গলবার কয়েকজন অটোচালককে সড়কের পার্শ্ববর্তী গাছের নিচে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। পথচারীদের চলতি পথে গাছের ছায়ায় খানিকটা বিশ্রাম করতেও দেখা গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে বৃষ্টি না হলে জনজীবন আরো প্রকট হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
ঝিনাইদহ :পশ্চিমের জেলাগুলোতে এবার আম কাঁঠালের উত্পাদন কম হবে। খরার কারণে কাঁঠালের বৃদ্ধি থেমে গেছে। আমের মুকুলও কম ধরেছে। তারপর বৈরী আবহাওয়ার কারণে মুকুল ও গুটি ঝরে পড়ে। কাঁঠালের মুচিও ধরেছে কম। মেহেরপুর সদর উপজেলার তেরঘরিয়া গ্রামের চাষি জিয়াউর রহমান জানান, তার ১০ বিঘা জমিতে আম বাগান আছে। এবার গাছে মুকুল কম আসলেও গুটি ভালো ধরেছে। কিন্তু খরায় গুটি ঝরে পড়ছে। এতে ফলন কম হবে। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভবনগর গ্রামের নাজমুল হোসেন বলেন, তাদের গ্রামে দেড় হাজার বিঘা জমিতে আমের বাগান তৈরি হয়েছে। বাগানগুলোতে গাছে ভালো গুটি ধরেছিল। কিন্তু টানা খরার কারণে গুটি ঝরে পড়ছে। এতে আমের ফলন কম হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মেহেরপুরের উপপরিচালক স্বপন কুমার খাঁ জানান, টানা খরার কারণে আমের গুটি ঝরে পড়ছে। এতে ফলন কম হবে। যশোর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. জাহেদুল আমিন বলেন, এবার খরার কারণে আমের গুটি ঝরে পড়ছে। কাঁঠালও কম ধরেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরের উপপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এবার কাঁঠালের মুচি কম ধরেছে। তারপর খরার কারণে কাঁঠাল বড় হচ্ছে না। এতে ফলন কম হবে।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) : ফুলবাড়ীতে চার-পাঁচ দিন ধরে চলছে দাবদাহ। জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এমন আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে অনাবৃষ্টি ও সঠিক সময়ে সেচ দিতে না পাড়ায় প্রচণ্ড দাপদাহে রবি ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কুড়িগ্রামের রাজারহাট আবহাওয়া ও কৃষি পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র রায় জানান, গেল চার দিন থেকে জেলার তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রয়েছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
