রসিকতা শুভ লক্ষণ নহে

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২১, ২২:০৯

পৃথিবীর ধনী-দরিদ্র যে কোনো দেশের জন্যই জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি বড় গুণ হইল জনগণের পালস বুঝিতে পারা। যাহারা বুঝিতে পারেন, তাহারা আর যাহাই হউক, জনগণের সঙ্গে রসিকতা করেন না, জনগণের সঙ্গে ফাজলামি করেন না। একটি সরকারকে সর্বদা জনগণের সকল কথা শুনিতে হইবে, তাহা নহে এবং উহাতে সরকারের যে সর্বদা ক্ষতির কারণ হয়, তাহাও নহে। কিন্তু জনগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া, জনগণের সম্মুখে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করা অথবা জনগণের নিকট হইতে সত্য গোপন করিয়া রাখিতে চেষ্টা করাই জনগণের সঙ্গে রসিকতার শামিল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে ইহা বুঝিতে পারিয়াছেন অনেক মনীষীই। তবে সবচাইতে ভালো উপলব্ধি করিয়াছেন যুক্তরাষ্ট্রের ধনকুবের গ্রেগরি ডেভিড ওয়াসন। তিনি বলিয়াছেন, ‘যেই মুহূর্তে তুমি জনতাকে বিদ্রুপ করিলে, রসিকতা করিলে, সেই মুহূর্তে জনতার নিকট হইতে তুমি জীবনের তরে দূরে সরিয়া গেলে।’ দুঃখের বিষয় উন্নয়নশীল বিশ্বের অধিকাংশ ক্ষমতাশালী মানুষই তাহা বুঝিতে পারেন না। বরং তাহারা জনগণকে বোকা ভাবেন, আর বোকা ভাবেন বলিয়াই জনগণের সঙ্গে রসিকতা করিয়া থাকেন। এই সম্পর্কে আব্রাহাম লিংকনের সেই কথাই স্মরণ করিতে হয়, ‘তুমি সকল মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানাইতে পারো, তুমি কিছু লোককে সকল সময়ের জন্য বোকা বানাইতে পারো, কিন্তু তুমি সকল মানুষকে সকল সময়ের জন্য কখনোই বোকা বানাইতে পারিবে না।’ 

ইহা যে কেবল মনীষীরাই বলিয়াছেন তাহা নহে। পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্মপুস্তকে নমরুদকে দুনিয়ার সবচাইতে ক্ষমতাশালী ও পরাক্রমশালী শিকারি হিসাবে চিহ্নিত করা হইয়াছে। নমরুদের পরাক্রমশালী হইবার কারণ ছিল চামড়ার তৈরি আদমের সেই কোট। গন্ধম ফল ভক্ষণের ফলে আদম-হাওয়াকে যখন পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয় তখন খোদা তাহাদের চামড়ার তৈরি কোট দিয়াছিলেন (জেনেসিস ৩ :২১)। এই পরাক্রমশালী নমরুদও হজরত ইব্রাহিমকে আগুনে পুড়াইয়া হত্যা করিতে চাহিয়া পারে নাই। বরং একটি দুর্বল ল্যাংড়া মশা তাহার পিছু লইয়া মস্তিষ্কে প্রবেশ করিয়া তাহাকে বধ করিয়াছে। এই নমরুদও কিন্তু মশাকে তুচ্ছ বলিয়া জ্ঞান করিয়াছিল। তফসিরে ইবনে কাসির হইতে বর্ণনা আছে, ৪০ বত্সর নমরুদকে ভয়ানক যন্ত্রণা ভোগ করিতে হইয়াছিল এবং প্রচণ্ড মস্তিষ্কের যন্ত্রণা লইয়া মৃত্যুবরণ করিতে হইয়াছে। এই সকল কাহিনির মধ্যেই আমাদের জীবন বিধান এবং রাষ্ট্র-সমাজ সম্পর্কিত বহু বার্তা রহিয়াছে। সেই ক্ষেত্রে জনগণ তো তুচ্ছ ভাবিবার মতো কোনো বস্তু বা প্রাণী নহে। অতএব জনগণকে যে বা যাহারা যত তুচ্ছ জ্ঞান করিবে, যত অবজ্ঞা করিবে তাহাদিগকে ততই পরিণামের কথা মাথায় রাখিতে হইবে। ইতিহাসে তাহার ভূরি ভূরি উদাহরণ রহিয়াছে। ফরাসি বিপ্লব গোটা পৃথিবীর ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করিয়া দিয়াছিল। এই বিপ্লবের ১৩টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হইয়া থাকে। অ্যাবসোলিউট মনার্কি, করাপ্ট লিডারশিপ, আনফেয়ার ল্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন, গভর্নমেন্টস ডেব্ট ডেফিসিট ফিনান্সিং, ফেইলর টু অ্যাকসেপ্ট রিফর্ম ছিল বিপ্লবের কারণসমূহের প্রধান। ফরাসি বিপ্লবের পরেও এই একই কারণে বহু দেশে বহুবার বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়াছে, প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার পতন হইয়াছে। কিন্তু আশ্চর্য হইয়া আমরা লক্ষ করি, ফরাসি বিপ্লবের সেই সমস্যাগুলি বর্তমান বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এখনো অতিমাত্রায় প্রকট রহিয়াছে। যাহারা এই সকল পাঠ লইবেন তাহারা নিজেদের পাশাপাশি জনগণের জন্যও কল্যাণ বহিয়া আনিতে পারিবেন। আর যাহারা এই পাঠ লইবেন না তাহারা কেবল বিশৃঙ্খলার চিহ্নই রাখিয়া যাইবেন।