আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নতুন ভ্যারিয়েন্টের আঘাত ভাবিয়ে তুলছে গোটা বিশ্বকে। সেই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে অসচেতনতার তীব্র ভয়াবহতা। করোনা ভাইরাসের ভারত ভ্যারিয়েন্ট—যেটার বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে বি.১.৬১৭, যা সর্বপ্রথম শনাক্ত হয় অক্টোবর মাসে। মানুষের অবহেলায় ও নতুন ভ্যারিয়েন্ট হঠাত্ ছড়িয়ে পড়ার ফলে দেখা দিয়েছে চরম অক্সিজেন সংকট। এক হসপিটাল থেকে অন্য হসপিটালে বাঁচার আকুতি নিয়ে ছুটে চলছে মানুষ। একই বেডে একের অধিক মানুষ সেবা নিচ্ছে, কেউ কেউ হসপিটালের বাইরে, গাছের নিচে বসে এমনকি রাস্তায় বসে চিকিত্সা তথা অক্সিজেনের সাপোর্ট নিচ্ছেন ।
আমরা এপর্যন্ত বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন স্ট্রেইন দেখেছি এবং এর ক্ষমতা সম্পর্কে জেনেছি। নতুন স্ট্রেইনে আগের চেয়ে কী বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে তার কিছুটা ধারণা নেওয়া যাক। আমরা এতদিন জেনে এসেছি সাধারণত করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে তার হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে বাইরে আসা ড্রপলেট থেকে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু নতুন স্ট্রেইনে যুক্ত হয়েছে কিছু পরিবর্তন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ড্রপলেট নিউক্লিয়াইয়ের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি।
এখন প্রশ্ন হতে পারে ড্রপলেট কী? কিংবা ড্রপলেট নিউক্লিয়াই কী? ড্রপলেট বলতে আমরা বুঝি কথা বলার সময়ে, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে নাক ও মুখ থেকে যে তরল বের হয়ে আসে, যা মাটিতে পড়ে যায় এবং অনেকক্ষেত্রে তা ছয় ফিট দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত যে কোনো ব্যক্তিকে আক্রান্ত করতে পারে। ড্রপলেট নিউক্লিয়াই হলো নিঃশ্বাস ছাড়ার সময়, কথা বলার সময়, হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে নাক ও মুখ থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্র তরল কণা যা মাটিতে পড়ে যায় না এবং ছয় ফিট দূরত্ব অতিক্রম করেও দীর্ঘ সময় বাতাসে ভেসে থাকতে পারে ও বাতাসের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ায়। একে এয়ারবর্ন স্প্রেডও বলা হয়। মেডিকেল জার্নাল দ্যা লানসেট এর এক গবেষণায় দেখা যায় ড্রপলেট নিউক্লিয়াই বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি বেশ লক্ষণীয় এবং ঝুঁকির।
ড্রপলেট এবং ড্রপলেট নিউক্লিয়াই দ্বারা সংক্রমণ ঝুঁকি থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয়—
১) প্রথমত সর্বোচ্চ প্রতিরোধী—তিন স্তর বিশিষ্ট কাপড়ের মাস্কের ব্যবহার করা। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসাতে ড্রপলেট বা ড্রপলেট নিউক্লিয়াই দ্বারা ভাইরাস শরীরে প্রবেশ ঠেকাতে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী এই মাস্ক।
২) নির্দিষ্ট দূরত্বতা অবশ্যই মানতে হবে। প্রয়োজনীয় কাজের ক্ষেত্রে যেমন—বাজার, ব্যাংকগুলোতে অধিক লোকের জমায়েত না করে বিকল্প উপায়ে কম পরিসরে কার্যক্রমের পরিকল্পনা করতে হবে।
৩) আবদ্ধ স্থান যেমন—অফিস রুমের কক্ষ, বাসায় রুমের কক্ষ যথাসম্ভব বাতাস চলাচলের উপযোগী করে তুলতে হবে। দীর্ঘ সময় লোকের চলাচলে আবদ্ধ জায়গায় ভাইরাস আঘাত হানতে পারে।
৪) এসির বাতাসে দীর্ঘ সময় থাকা যাবে না। কিছু সময় পরপর এসি বন্ধ করে ভিতরের আবদ্ধ বাতাস নির্গমনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৫) কারো সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে বাসা কিংবা রেস্টুরেন্টে নয় বরং খোলা পরিবেশে দেখা করাটাই উত্তম।
৬) ‘NDIR Co2’ মিটার ব্যবহার করে বিভিন্ন অফিসের বাতাস চলাচল স্বাভাবিক ভাবে হচ্ছে কি না—তা দেখা যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে কার্বন ডাইঅক্সাইডের মাত্রা যেন ৭০০ পিপিএমের নিচে থাকে।
এমন বেশ কিছু সাধারণ সচেতনতা অবলম্বন করলে আমরা কোভিড-১৯ থেকে দূরে থাকতে সক্ষম হব। এছাড়াও সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো মানের একটি অক্সিমিটার মেশিন কিনে রাখলে অসুস্থতা বিবেচনায় প্রয়োজনে বাসায় প্রাথমিকভাবে অক্সিজেন স্যাচুরেশন চেক করে দেখা যেতে পারে। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯০-৯৫-এর কম থাকলে বিলম্ব ছাড়াই চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী অক্সিজেন সাপোর্ট নিতে হবে কিংবা হসপিটালে যেতে হবে।
করোনার নতুন এই ভ্যারিয়েন্ট-বি.১.৬১৭ দেশে প্রবেশ করলে সৃষ্টি হবে বিপজ্জনক পরিস্থিতি। সুতরাং পার্শ্ববর্তী দেশের নতুন এই ধরন নিয়ে দেশের প্রতিটি বিভাগে বিশদভাবে চিন্তার পাশাপাশি সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে ১৪ দিনের বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইন দিতে হবে। অন্যদিকে আমাদের দেশে চাহিদার তুলনায় অক্সিজেন কম উত্পন্ন হওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অক্সিজেন আমদানি করা হতো; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে অক্সিজেন সংকট দেখা দেওয়ায় ইতিমধ্যেই অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি, যা আমাদের জন্য এক প্রকার অশনিসংকেত।
সার্বিক দিক বিবেচনায় সামনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাসম্ভব বাসায় থাকাটা একান্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাস্ক পড়তে হবে এবং অন্যকে মাস্ক পড়ার গুরুত্ব বোঝাতে হবে, উত্সাহিত করতে হবে। স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। বাইরে থেকে এসে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হতে হবে। নিজেরা সহযোগিতা করলে এবং নিয়ম মেনে চললে আমাদের বিপদ বা ঝুঁকি অনেকটা হ্রাস পাবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ পেতে কতদিনের প্রয়োজন তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু সচেতনতার বিষয়টি আমাদের নিজেদের ক্ষমতার মধ্যে রয়েছে। তাই সবাইকে এখনই সতর্ক হতে হবে।
n লেখক : শিক্ষার্থী, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ
