মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং আফগান ভবিষ্যত্

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০২১, ২২:২০

কিছুদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ঘোষণা দেন, ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সকল সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এর আগে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বছরের মে মাসের মধ্যে সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কথা বলেছিলেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সেনা প্রত্যাহারের এ সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বরে করলেন। এ সময়কাল বাড়ানোর মাধ্যমে তিনি আফগানিস্তানের বিবদমান পক্ষদের নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার জন্য আরো একটু সময় বাড়িয়ে দিলেন মূলত। এটা সহজেই অনুমান করা যায় যুক্তরাষ্ট্র গত ২০ বছরে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে এখন ক্লান্ত। তারা এ যুদ্ধের বোঝা এখন আর বইতে চায় না। তবে মার্কিনিরা আফগানিস্তানকে এক প্রকার অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রেখে বিদায় নিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার সাধারণ মুসলিমরা আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য প্রত্যাহারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও অনেক বিশেষজ্ঞের মধ্যে এই নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। তারা আশঙ্কা করছেন মার্কিন সৈন্য এবং ন্যাটোর অনুপস্থিততে আফগানিস্তানে নতুন করে সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটাবে। এছাড়া সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে এখনো কোনো রকম সমঝোতা চুক্তি হয়নি। ফলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ এবং তার সঙ্গে নতুন করে সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটবে।

বর্তমানে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সম্মিলিতভাবে প্রায় ১২ হাজার সেনা রয়েছে। মার্কিন সেনাদের সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশরাও আফগানিস্তান থেকে তাদের ৭৫০ জন সেনাকে একই সময়ে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনবে। ন্যাটোও ঘোষণা দিয়েছে তারা রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের নেতৃত্ব অনুসরণ করবে (সূত্র বিবিসি)। গত ২০ বছরে তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া তারা তাদের ২ হাজার সার্ভিস মেম্বারকে হারিয়েছে এ যুদ্ধে। ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর ইরাক এবং সিরিয়া কবজা করে নেয় আইএস। আফগানিস্তানে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের পর এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।এরকম কিছু ঘটলে নতুন করে ক্ষমতা নিয়ে তালেবানের সঙ্গে আইএসের দ্বন্দ্ব শুরু হবে। এছাড়া আফগানিস্তানে রয়েছে সশস্ত্র হাজারা, উজবেক ও তাজকি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। এদের মধ্যে হাজারা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হাজারা মূলত শিয়া মুসলমান। অন্যদিকে তালেবানরা পশতু সুন্নি মুসলমান। এই সংখ্যালঘু হাজারা সম্প্রদায় আফগানিস্তানে অনেকদিন যাবত্ বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। তালেবান এবং আইএস উভয়েই হাজেরাদের তাদের কমন শত্রু মনে করে। আফগানিস্তানে প্রায় ৩০ লক্ষ হাজারা শিয়ার বসবাস। ১৯৯৭ সালে হাজারা এবং তালেবানদের মধ্যে সংঘাত চরমে পৌঁছায়। এ সময় তালেবানরা হাজারা বিদ্রোহীদের দখলে থাকা মাজার শরিফ দখল করতে গেলে প্রায় ৬০০ তালেবান যোদ্ধার হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরবর্তী বছর তালেবান যোদ্ধারা দ্বিগুণ শক্তিতে ফিরে আসে এবং মাজার শরিফ পুনর্দখল করে। এরপর প্রতিশোধস্বরূপ চলতে থাকে হাজারাদের ওপর গণহত্যা। জাতিসংঘের হিসাবমতে, দুই দিন ধরে চলমান গণহত্যায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার হাজারা খুন হয়। হাজারাদের পাশাপাশি উজবেক ও তাজিকিদের সঙ্গেও ভালো বোঝাপড়া নেই তালেবানদের। এ ছাড়া আফগানিস্তানের বর্তমান সরকার বিলুপ্ত হলে সরকারের অধীনে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর  কী হবে, তা নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। অর্থাত্ বোঝা-ই যাচ্ছে এসব সমস্যার সমাধান না করে মার্কিন সৈন্যদের আফগানিস্তান ত্যাগ সেখানকার সমস্যাগুলো আরো বাড়িয়ে দেবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, তালেবান যোদ্ধারা একচ্ছত্র ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু বিবদমান অন্য পক্ষগুলো তালেবানরদের এই একচ্ছত্র ক্ষমতা কখনোই মেনে নেবে না। আর তালেবান যোদ্ধারাও একচ্ছত্র ক্ষমতার  জন্য আরেকটি দীর্ঘায়িত যুদ্ধ করতেও পিছপা হবে না। যে কোনো একপক্ষ একদম নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলতেই থাকবে। অর্থাত্ বোঝা যাচ্ছে, আফগানিস্তান এখন আরেকটি সংঘাতের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়