ফাঁস হয়ে যাওয়া একটি অডিও টেপে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফকে হতাশা প্রকাশ করে বলতে শোনা গেছে যে, ইরানের পররাষ্ট্র নীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডস বা বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী এবং রাশিয়ার নির্দেশে এই বাহিনীই ইরানকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িয়েছে। এই টেপ নিয়ে এখন চলছে তুমুল হৈচৈ। সামাজিক মাধ্যমে এই বক্তব্য ব্যাপক বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, অনেককে হতভম্ব করেছে এবং এ নিয়ে তৈরি হয়েছে সোরগোল। খবর বিবিসির
জারিফের এই বক্তব্য থেকে যেটা প্রকাশ পেয়েছে, সেটা অনেক ইরানিই অনেক দিন ধরে সন্দেহ করছিলেন। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো—এই মন্তব্য এসেছে খোদ জারিফের মুখ থেকে, যিনি একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিক, সাধারণত খুবই সতর্কতার সঙ্গে তিনি কথা বলেন এবং ইরানের রাজনীতিতে তিনি একজন মধ্যপন্থি বলে বিবেচিত।
রাশিয়ার সমালোচনা
জারিফ বলেছেন, রাশিয়াসহ বিশ্বের ছয়টি শক্তিধর দেশের সঙ্গে ২০১৫ সালে একটা পরমাণু চুক্তিতে ইরান যাতে রাজি না হয়, তার জন্য যা করা সম্ভব সব চেষ্টা করেছিলেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরফ। তিনি অভিযোগ করেছেন যে রাশিয়া কখনো চায়নি যে পশ্চিমের সঙ্গে ইরানের একটা সমঝোতা হোক। তার এই মন্তব্য বিস্ময়কর কারণ সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে ল্যাভরফের সঙ্গে জারিফের একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং রাশিয়া ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
এই টেপ ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এমন একটা সময়ে যখন ভিয়েনায় পরমাণু চুক্তি পুনরুদ্ধারের এক পরোক্ষ আলোচনা চলছে ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকান সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ইরানের ওপর আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর এবং এর জবাবে ইরান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ শুরু করার ফলে ২০১৫ সালের চুক্তিটি ভেঙে পড়ার মুখে পৌঁছেছিল। জারিফ বলছেন, রেভল্যুশনারি গার্ডস কখনো এই চুক্তি চায়নি এবং এটা আটকানোর জন্য তারা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করেছিল। তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার উল্লেখও করেছেন যে, ক্ষেপণাস্ত্রের গায়ে তারা হিব্রু ভাষায় লিখেছিলেন ‘ইসরাইলের নাম পৃথিবী থেকে মুছে ফেলা হোক’। এছাড়াও ২০১৬ সালের গোড়ার দিকে উপসাগরে দুটি টহল নৌকায় ১০ জন মার্কিন নাবিককে আটক রাখার বিষয়েও কথা বলেছেন জারিফ। এই চুক্তি বন্ধ করার চেষ্টার উদাহরণ ছিল এই দুটি ঘটনা বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
রেভল্যুশনারি গার্ডসের বিরুদ্ধে অভিযোগ
জারিফ আরো অভিযোগ করেছেন যে রেভল্যুশনারি গার্ডস তাকে অনেক বার পাশ কাটিয়ে কাজ করেছে। তিনি ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারির সকালের দিকের একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন যখন কাসেম সোলেইমানির মৃত্যুর বদলা নিতে ইরাকি একটি সেনাঘাঁটির ওপর ইরান আক্রমণ চালায়। ঐ ঘাঁটিতে আমেরিকান বাহিনীর সৈন্য এবং এক ডজনের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। তিনি বলেন, ঐ হামলা চালানোর দুই ঘণ্টা পর তিনি এই খবরটি জানতে পারেন। তিনি আরো বলেন, সেদিনই আরো পরের দিকে রেভল্যুশনারি গার্ডস বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিট যখন, আপাতদৃষ্টিতে ভুলক্রমে, ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করে, তখন অধিনায়করা তাকে শুধু বলেছিলেন, ইরানের সংশ্লিষ্টতার কথাটা তিনি যেন অস্বীকার করেন। ঐ যাত্রীবাহী বিমানটি সবেমাত্র তেহরান থেকে আকাশে উড়েছিল এবং বিমানের ১৭৬ জন যাত্রীর প্রত্যেকেই মারা গিয়েছিলেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, অডিও টেপে জারিফের এসব মন্তব্য প্রসঙ্গ ও ঘটনাক্রম ছাড়াই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তারা বলেছেন পুরো সাক্ষাত্কারটি তারা প্রকাশ করবেন। ঐ মুখপাত্র বলেছেন, ঐ সাক্ষাত্কারের রেকর্ডিং তাদের কাছে নেই এবং সেটি নিরাপত্তা বিধান ঐ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না।
