সম্প্রতি করোনায় চলে গেলেন নবনির্বাচিত সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু, দৈনিক ইত্তেফাকের সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার কাজী মন্জুরুল কাদের ও অ্যাডভোকেট মালা রউথসহ আরো অনেকেই। জীবন নিয়ে শঙ্কিত সবাই। মৃত্যুচিন্তায় বিভোর আত্মা, ঝাপসা চোখে ভাসে পরকালের ছায়া। অস্পষ্ট দূরদৃষ্টিতে কানে আসে কবরের করুণ আকুতি। সেই আবহেই হয়তো কবি জসীমউদ্দীন তার কবর কবিতায় লিখেছেন, ‘মজিদ হতে আজান হাঁকিছে বড় সকরুণ সুর, মোর জীবনের রোজ কিয়ামত ভাবিতেছি কত দূর।’
ছিয়ানব্বইয়ে আইনমন্ত্রী হয়েই মতিন খসরু জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সংসদে কুখ্যাত কালো আইন ‘ইনডিমনিটি অধ্যাদেশ’ বাতিল করেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শুরু করে আসামিদের শাস্তিদানের প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে দেশের সংবিধান, সংসদ ও বিচারের ইতিহাসে স্থান করে নেন। তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইনবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। ছয় বারের নির্বাচিত এমপি মুক্তিযোদ্ধা মতিন খসরু ছিলেন সুদর্শন, স্বল্পভাষী ও পরিশ্রমী। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে তিনিই হলেন সেই সৌভাগ্যবান যিনি উপজেলা থেকে রাজনীতি ও ওকালতি শুরু করে আইন পেশা ও রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে উঠতে সক্ষম হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্যও ছিলেন। রাজনীতির সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম না নিয়েও সোনার মুকুটটি তিনি ঠিকই মাথায় পরেছিলেন।
আমেরিকার বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ক্যাপিটল হিল ভাঙচুরের ঘটনার পর রিপাবলিকান দলের অনেকেই দুই সাবেক স্পিকার জন বয়নার ও তরুণ পল রায়ানকে নেতৃত্বে আসতে অনুরোধ করে। জনকল্যাণমূলক কাজ রিচার্স, লেখালিখি ও সেমিনারে বক্তব্য দিয়ে সময় কাটাবেন জানিয়ে উভয়ই তা প্রত্যাখ্যান করেন। এখানকার প্রেসিডেন্টগণও তাই করেন। বাংলাদেশে তার ব্যতিক্রম। যত ওপরে ওঠা যায়, মরণ অবধি, ক্ষান্ত দিতে মনও নাহি চায়।
বিগত বারের নির্বাচনে অপেক্ষাকৃত তরুণ কেউ মনোনীত হলে, হয়তো তিনি সিনিয়র নেতা হিসেবে আরো কিছুদিন দলের নেতৃত্ব দিতে পারতেন। আইনজীবী বলয়ে নেতৃত্ব শূন্যতা দেখা দিত না। ছিয়ানব্বইয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে আইনমন্ত্রী হলে, কোর্টের বড়দের সঙ্গে আমি ও বুদুভাইও তাকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলাম ধানমন্ডির তারই এক আত্মীয়ের বাসায়। প্রটোকলের কারণে নিজের ভাড়া বাসা রেখে যেখানে তাকে উঠতে হয়েছিল। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে নবী সাহেবের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার বিষয়ে সাহায্য করতে বলেছিলেন। তিনি তার এবং দলের অনেক মামলার বিষয়ে আমাদের চেম্বারে প্রায়ই আসতেন, নবী সাহেবের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছেন। আইন মন্ত্রণালয়কে আমেরিকার আদলে অ্যাটর্নি জেনারেলের অধীনে আনার নবী সাহেবের একটা প্রচেষ্টা ছিল। এ নিয়ে তাদের দুজনের মধ্যে কিছুটা দূরত্ব ছিল বইকি। কিছু মানুষ নবী সাহেবকে এ ব্যাপারে উত্সাহ দিত। বাংলাদেশে তা সম্ভব নয় বলে, মতিন ভাইয়ের কথামতো আমিও স্যারকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। ফলে পরবর্তীকালে নবী সাহেবকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। মনে পড়ে আমেরিকা চলে আসার আগে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘আপনি সত্যিই চলে যাচ্ছেন? অচিরেই কিন্তু এএজির পদ খালি হবে।’ এবং হয়েও ছিল তাই।
সরাসরি স্পষ্ট করে কথা বলতেন। তখনো তদবির বাণিজ্য ব্যাপকতা লাভ করেনি। কাজ নিয়ে গেলে সম্ভব হলে করে দিতেন, না হলে স্পষ্ট করেই বলে দিতেন। ঢাকার এক সাব-রেজিস্ট্রারের বদলি ঠেকাতে গিয়েছিলাম আমি আর বুদু ভাই। শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘আপনারা আমার নেতা, যে তদবির করলেন, আপনাদের আমার অনেক ওপরের বড় নেতারা একই তদবির আমাকে করেছেন। সাবরেজিস্ট্রাররা বিদেশে বাড়ি করে, ছেলেমেয়ে বিদেশে পড়ায়, বিলাসবহুল জীবনযাপন করে কীভাবে? সেটা আমি দেখতে চাই।’ আমরা চা-টা খেয়ে হাসি মুখেই চলে আসি। সেই দেখাটা তিনি দেখেছিলেন কি না, তা জানা হয়নি।
অ্যাডভোকেট কাজী মন্জুরুল কাদের, অত্যন্ত সজ্জন ও ভালো মানুষ ছিলেন। বহুল প্রচারিত মিডিয়া মোড়ল দৈনিক ইত্তেফাকের সুপ্রিম কোর্ট রিপোর্টার হিসেবে বিচারপতিগণ উনাকে বেশ সমীহ করতেন। তিনি আবার ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন স্যারের জুনিয়র ছিলেন। আমি তত্কালীন ভোরের কাগজ ও জনকণ্ঠের সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদক হিসেবে তার কাছ হতে অনেক সহযোগিতা নিয়েছি।
সুপ্রিম কোর্ট বারের করোনা কাব্যের করুণ কান্নাটির নাম হলো অ্যাডভোকেট মালা রউথ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্রী ছিলেন তিনি। দুঃসহ বেদনা, দারুণ অর্থকষ্ট নিয়ে শেষে করোনায় জীবন যুদ্ধে পরাজিত হন। কিন্তু এমনটিত হওয়ার কথা ছিল না। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী, আজীবন ও পারিবারিক সূত্রেই মুজিবাদর্শের সৈনিক। বারের হাতেগোনা কজন মহিলা উকিলের একজন ছিলেন তিনি। ছাত্রলীগের মিছিল করেছেন ক্যাম্পাসে। সাহস নিয়ে জোর গলায় দলের পক্ষে কথা বলতেন। কিন্তু হায়, বিধি বাম, সৌভাগ্য নিয়ে জন্ম হয়নি তার। ভাগ্যে একটি সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ বা অন্য কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও কিছু জোটেনি তার কপালে। বিজ্ঞ আইনজীবী নেতারা, তাকে বেঁচে থাকার মতো একটা কিছু দেওয়ার যোগ্য মনে করেননি। কত জনেই তো জীবনের কোন পাঠে, ঘাটে বা মাঠে মিছিল করা তো দূরের কথা জয় বাংলা বা বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ না করেও ছোট, বড় ও আরো বড় কত কিছু হয়ে গেলেন তার ইয়ত্তা নেই। মেধা, বিদ্যা আর অভিজ্ঞতার কথা না-ই বা বললাম।
আমরা কথায় কথায় বঙ্গবন্ধুর ভাষণের উদ্ধৃতি দিই। কারাগারের রোজ নামচার, অসমাপ্ত আত্মজীবনীর কথা বলি। সেসব অনুসরণ করি কতটুকু? তিনি তার ভাষণে বলেছিলেন, আমাদের উকিল ও বিচারক সাহেবরা পেশা/চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আগে ছেলে, মেয়ে বা মেয়ের জামাইয়ের হাতে ফাইলপত্রও মক্কেলদের হস্তান্তর করে যান। আজও চলছে তাই। মাননীয় প্রধান মন্ত্রী ছাড়া কেউ কোথায়ও নেই দেখার। পরিবারের একাধিক সদস্য কেউ বারে কেউ বেঞ্চে, কেউ-বা সরকারি অন্য পদে আছেন মহা আনন্দ ও বহালতবিয়তে। পেশাগত সদাচার, ন্যায়নীতি, দায়িত্ব ও মূল্যবোধের তোয়াক্কাই করছি না কেউ।
সবার আত্মার শান্তি কামনা করি।
n লেখক : সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক আইনজীবী, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী
