আলীম হায়দারের ‘স্বপ্নলোকে সন্ত্রাস’

আপডেট : ০২ মে ২০২১, ১৪:১০

স্বপ্নলোকে সন্ত্রাস ১

কুশির ফাঁকে ফাঁকে ফুল খেলানোর সময় এটা
কোয়ারেন্টাইনে আছে নদী—গাছপালা
তেজপাতার ডালে লালটিকার বুলবুলিটা
একলা ঘুঘু, জোড়া ঘুঘু, হঠাৎ দেখা দোয়েলটা—
নিমের ডগায় নদীর প্রেম চক্রাবক্রা মাছরাঙা

শুধু চৈতালি বায়ুর চলাফেরা বেড়েছে অবাধ
আকাশে তুলোর ঝাপটা, মেঘে মেঘে সাগর উতলা
স্বকীয় সজ্জা ফিরেছে রাতের—শুনেছি নির্জনতা
লুটপাট হয়ে যাওয়া রূপ ফিরে পেয়েছে বসন্ত

কোলাহল কমেছে হাটে, বাট্টা কমেছে ঘাটে—
সন্ধ্যার বাঁশঝাড়ে বেড়েছে বকের পাখার ঝাপটা—

জঙ্গলে ভাঁটের ফুল, কলি এসেছে শিয়ালমুতরায়,
তবুও ঘোমটা খোলেনি জোনাই পোকা—
এবার লকডাউন হয়ে যাও খামোশ মন্ত্রীরা
আসছে অমাবশ্যায় ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরে আসুক 
                আলোর পাখিরা—

*********************************************************

স্বপ্নলোকে সন্ত্রাস ২

দেশে লকডাউন চলছে, সবাই হোম কোয়ারেন্টাইনে
সড়কে সড়কে সেনা টহল—পুলিশ—ম্যাজিস্ট্রেট
এদিকে জ্যোতিষীর পেট খালি জনশূন্য শুক্রবারে
ঘরে চাল নেই—জ্বলেনি চুলো—জ্বালাটা কে বুঝবে!
ফুটপাতে ভাগ্য বলা লোকটি আসলে দিনমজুর
কখনো নিজের হাতটি দেখার সুযোগ পায়নি সে!

*********************************************************

স্বপ্নলোকে সন্ত্রাস ৩

জন্মের আগে একা ছিল জঠরের সময়গুলো—
মৃত্যুর পর কাফন মুড়িয়ে আসে চির একাকিত্ব

জীবন হলো নদীর উপর উড়তে থাকা সাঁকো 

করোনাভাইরাস অমোঘ নিঃসঙ্গতা মনে করালো
তুমুল কোলাহল মানে আইসোলেশনের প্রতীক্ষা
মানুষ শুধুই নিজের পাহারাদার, বাকি সব মিথ্যা।

*********************************************************

স্বপ্নলোকে সন্ত্রাস ৪

শাবান মাসের ভরা পূর্ণিমা শেষ, ভাগ্যরাত্রির চন্দ্রপ্রহর কেটেছে
চৈতালি হাওয়ার ঝাপটা মেখে, তারপর আরও এক রাত গেছে
দ্বিপ্রহরের আকাশজুড়ে সন্ধানী মন খুঁজে ফেরে নিজেকে—
সওদাগরি সময় শেষে হারানো আত্মার প্রেতাত্মারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে

চাওয়া পাওয়ার বাইরেও বিস্তর জীবন থাকে, সন্ধান করি
ধ্রুপদী সত্যের, কোথা থেকে ভেসে আসে অলৌকিক জ্যোতি
চারপাশে যা দেখি মানুষ না, দুপেয়ে জানোয়ার ভরেছে পৃথিবী

পলাশবাড়ির কবিকুঞ্জে দাঁড়িয়ে আমি চন্দ্রাহত হয়ে থাকি
ইউরোপ-আমেরিকা কাফনে মুড়ে যমরাজ ছায়া ফেলে প্রিয় শহরে  
গাইবান্ধা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে, মৃতদের মিছিল হবে!

জিলহজের জোছনায় বুক ভাসাতে পারবে ক’জন, কে জানে?

কোভিড নাইনটিন ভাইরাসের ছোঁয়া নেই হু হু করা বাসন্তী চাঁদে
শুনেছি একটি মাত্র বাঘ আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু লাখ মানুষ মরছে
তবুও—মানুষের চেয়ে পাশবিক জন্তু আর কিছু কী আছে?

কাকা ডাকা জোছনা, গাছের সাথে গাছের মিতালে বাসরি বাজে
ঝোপঝাড় কেঁপে উঠে, দমকা হাওয়া নাকে—চোখে—ফুসফুসে—
তবু মনুষ্য নামের পশুরা ঘুমায়, শুধু টিকটিকি জেগে থাকে বুকে।

চন্দ্রাহত হয় না যে, সে মানুষ নয়; আস্ত জানোয়ার হয়ে গেছে।
হিংস্রতার গ্রাস থেকে নরম মৃত্তিকা একদিন নিশ্চয়ই মুক্তি পাবে।

*********************************************************

স্বপ্নলোকে সন্ত্রাস ৫

তবুও ভ্যাবসা গরম ছিল উচাটন মধু মাসের শেষ বিকেলে—
ঘরবন্দি সময়গুলোর প্রতিটি সন্ধ্যাই ভেজা ছিল শিশিরে 

এবারের চৈত্র অনেকটাই শান্ত, শীতের সেতারে বেজেছে ফল্গুহাওয়া
কণ্ঠজুড়ে ছিল প্রজাপতি মৌমাছি পতঙ্গ বিহঙ্গের পুষ্পিত বিরহমালা
উত্তর আকাশে নিয়মিত সপ্তর্ষিমণ্ডল, পশ্চিমে জ্বলজ্বলে শুকতারা
বিকেলের আকাশলীনায় রাতভর ঝিকিমিকি আলোর মেলা—
প্রকৃতির প্রতিশোধে ক্ষয়ে যাওয়া প্রাণগুলো নক্ষত্রে উঁকি দেয়
জানায়— অভিমানের কথা, অভিশাপ দেয় রক্তের পরম্পরা।

হুট করে খসে পড়া ধুমকেতুর কান্নায় ভারী হয় পূবালি হাওয়া—
বৃদ্ধর অবয়ব, নারীর অবয়ব, শিশুর অবয়ব, প্রাণচঞ্চল ক্রীড়াবিদ,
এই গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় লোকহাসানো মানুষটার আর্তনাদ
গুমোট করে তোলে নিঃশ্বাস, নক্ষত্রে সাজানো নকশিকাঁথায়
ঝরে যাওয়া প্রাণের বর্ণিল মালা হয়ে ওঠে মনুষ্যত্বের হাহাকার—
এই বসন্ত মানুষের মুখোশ খুলে দিয়ে গেছে—
মায়ের কবরে মাটি দিতে যায়নি নাড়ি ছেঁড়া ছেলে
আইসোলেশনে থাকা প্রিয়মুখের কথা মনে হলে সবাই হাত ধুচ্ছে

এবারের বসন্তে অবলা পৃথিবী নিজেকে বাঁচানোর প্রতিঘাত করেছে
শোকের সুরেলা বিউগলে ধূসর গ্রহজুড়ে অবিরাম প্রাণকলি ফুটেছে।

ইত্তেফাক/জেএইচ