‘এই জয় বাংলার জয়’

আপডেট : ০২ মে ২০২১, ২২:২২

পশ্চিমবঙ্গে এইবারের বিধানসভা নির্বাচনের মতো এত জটিল, কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অতীতে আর কখনো হয় নাই বলিয়াই প্রতীয়মান হইতেছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি যখন নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হইল, তাহার পরের দিন হইতে দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গ জুড়িয়া একটি বিশেষ পোস্টার ও দেওয়াল লিখন। সেইখানে লেখা ছিল—‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়।’

কথাটি তাত্পর্যপূর্ণ। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ ছিল যে, বহিরাগতরা আসিয়া বাংলাকে দখল করিতে চাহিতেছে। গত ২৭ মার্চ হইতে আট দফায় নির্বাচন হইয়াছে। এই সময় আমরা দেখিয়াছি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় সর্বক্ষণ পশ্চিমবঙ্গেই পড়িয়া রহিয়াছেন। ২০১৯-এর লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গে অত্যন্ত ভালো ফল করিবার পর বিজেপি স্বপ্ন বুনিতে শুরু করিয়াছিল পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের। যদিও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাহারা পশ্চিমবঙ্গে মাত্র তিনটি আসনে জয় পাইয়াছিল; কিন্তু ২০২১ সালের নির্বাচনে যেন তেন প্রকারেণ ক্ষমতা দখলের জন্য বিজেপি চূড়ান্তভাবে মরিয়া হইয়া উঠে। এই জন্য তাহারা গত ডিসেম্বর হইতে এপ্রিল অবধি পাঁচ মাসে রেকর্ড ভাঙিয়া জনসংযোগ করিয়া থাকে। আমরা দেখিয়াছি, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই ভোট হইতেছে ভারতের আরো চারটি রাজ্যে—তামিলনাড়ু, কেরালা, পন্ডিচেরি ও আসামে; কিন্তু সর্বভারতীয় স্তরেও মিডিয়ার যাবতীয় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত ছিল পশ্চিমবঙ্গ লইয়াই। ইহার কারণ অনুসন্ধানে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা চমকপ্রদ কিছু তথ্য দিয়াছেন। ভারতের একজন প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলিয়াছেন—এইবারের পশ্চিমবঙ্গের ভোটকে পলাশীর যুদ্ধের সহিত তুলনা করা যায়। ১৭৫৭ সালে রবার্ট ক্লাইভের সেনা যেইভাবে নবাব সিরাজউদ্দৌল্লার বাহিনীকে পরাস্ত করিয়া বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরাইয়া দিয়াছিল, সেইভাবেই এই নির্বাচন অন্তত পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের গতিপথ নির্ধারণ করিয়া দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

মূলত উত্তর ও মধ্য ভারতের গোবলয়ের দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে একটি বিজাতীয় সংস্কৃতি আমদানি করিতে চাহিয়াছে বলিয়া মনে করিয়াছেন পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্ জনগোষ্ঠী। মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের দৃষ্টিতে, রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পশ্চিমবাংলার নিজস্ব ভাষা-শিল্প-মননের সহিত যাহাদের কোনো মিল নাই—তাহারা তো পশ্চিমবঙ্গে ‘বহিরাগত’ই। সুতরাং মমতার দেওয়াল লিখন—‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’—কথাটির মধ্যে ‘বহিরাগত’দের পশ্চিমবঙ্গে স্থান না প্রদানের স্পষ্ট বার্তা রহিয়াছে। সেই বার্তাতেই ভূমিধস সাড়া দিয়াছেন পশ্চিমবঙ্গের জনগণ। তাহারা দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসকে জয়ী করিয়াছেন। তৃণমূলের প্রতীক যেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখচ্ছবি হইয়া উঠিয়াছিল। তিনি তাহার দলীয় প্রার্থীদের ভোটপ্রচারে বলিয়াছেন যে, ঐ প্রার্থীদের দোষগুণ দেখিয়া নহে, তাহাকে দেখিয়াই যেন ভোট দেওয়া হয়। তিনিই যেন ২৯৪টি কেন্দ্রে ভোটে দাঁড়াইয়াছেন! এই আট দফা নির্বাচনে আমরা পশ্চিমবঙ্গের সংবাদ চ্যানেল ও অনলাইন পত্রিকার মাধ্যমে দেখিয়াছি—নির্বাচনে সহিংসতা কাহাকে বলে কত প্রকার ও কী কী। ভাড়াটে গুন্ডাদের দিয়া নহে, বরং স্ব স্ব এলাকার নিজেদের বিভক্তির মধ্যেই তাহারা উত্তেজনার পারদ চূড়ায় তুলিয়াছে। ধাওয়া-পালটাধাওয়া, হামলা-প্রতিহামলা, ভাঙচুর-নৃশংসতার হেন কোনো খারাপ দৃষ্টান্ত নাই যাহা হয় নাই। তবে দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেইখানে দিনের পর দিন ঠায় অবস্থান করা সত্ত্বেও নির্বাচন কিন্তু নির্বাচনের মতোই হইয়াছে। ইহাই ভারতের গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। ইহার প্রশংসা করিতেই হয়। ইহার সহিত প্রশংসা করিতে হয় মমতার অকুতোভয় সংশপ্তকের মতো লড়াইয়ের। নির্বাচনের শুরুতেই মমতা পায়ে চোট পান। তিনি নির্বাচনের প্রচারপর্ব সারিয়াছেন হুইলচেয়ারে বসিয়াই। নেতৃত্বে কেমনতর মেধা লাগে, কী কী ধরনের বিশেষ গুণ থাকিতে হয়, তাহার বড় উদাহরণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার প্রথিতযশা কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আশির দশকে আবিষ্কার করিয়াছিলেন এই অগ্নিকন্যাকে। নকশালবাড়ি আন্দোলন ও নানা অস্থিরতায় যখন পশ্চিমবঙ্গ অন্যরকম হইয়া উঠিয়াছিল, তখন কবি সুভাষ লিখিয়াছিলেন—‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,/ দুর্যোগে পথ হয়, হোক/ দুর্বোধ্য চিনে নেবে যৌবন আত্মা।’ সেই ধ্বংসের বার্তার মধ্যে, দুর্যোগের পথে নূতন ‘যৌবন আত্মা’ তিনি আবিষ্কার করিয়াছিলেন। তাহার সেই আবিষ্কারের নাম ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’। মমতাকে বাহ্যত ‘আবেগ’ দ্বারা অধিক তাড়িত বলিয়া মনে হইলেও, প্রকৃতার্থে তাহার নেপথ্য রসায়ন জনমানুষের অধিকার। সাদা-কালো-সবুজের ছোঁয়া নিরলংকার বসন ও হাওয়াই চপ্পলে তিনি চৈত্রের প্রখর তপন তাপেও ছাতা মাথায় চলেন না—তৃণের কাছাকাছি থাকবেন বলিয়া। গতকালের ভূমিধস জয়ের পর মমতা বলিয়াছেন, এই জয় বাংলার জয়।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে একটা ‘বিদ্রোহী সত্তা’ চিরকালই কাজ করেছে। সেই ৭৭ সাল হইতেই পশ্চিমবঙ্গ কখনো ভারতের কোনো জাতীয় দলকে স্থান দেয় নাই সম্ভবত তাহাদের ‘নিজস্বতা’ ও ‘বিদ্রোহী সত্তা’র কারণে। ব্রিটিশ ভারতে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি জি কে গোখলে শতাধিক বত্সর পূর্বে বলিয়াছিলেন, বাংলা আজকে যাহা ভাবে ভারত তাহা ভাবে আগামীকাল। মমতা ইহাকে নূতন করিয়া বলিয়াছেন, বাংলা আজকে যাহা করে, বাকি ভারত তাহা আগামী দিনে করিবে। জনমোহিনী আপাদমস্তক মানবিক সত্তাসম্পন্ন মা-মাটির মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভূমিধস জয়ের জন্য অভিবাদন।