নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সরকার গঠন করতে চলেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির দল তৃণমূল কংগ্রেস। সব বুথফেরত জরিপকে ভুল প্রমাণ করে গতবারের চেয়েও বেশি আসন পাচ্ছে তৃণমূল। তারা ২১৫টি আসনে জয়ী হতে চলেছে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে আবির্ভাব ঘটেছে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির। সরকার গঠনের লক্ষ্যে জোর তত্পরতা চালালেও তারা মাত্র ৭৫টি আসনে জিততে চলেছে। এছাড়া সংযুক্ত মোর্চা একটি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি আসনে জয়লাভ করতে যাচ্ছে।
গত প্রায় দুই মাস ধরে আট দফায় অনুষ্ঠিত ম্যারাথন ভোটগ্রহণের পর গতকাল রবিবার ভোট গণনার পর ফল ঘোষণা শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গের ২৯৪ আসনের বিধানসভায় সরকার গড়তে যে কোনো দলের ১৪৮ আসন দরকার। যদিও দুই জন প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে দুটি আসনে ভোটগ্রহণ স্থগিত রয়েছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বনাম মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলার নিজের মেয়ে মমতার দলেরই জয় হয়েছে। এ ফলে চরম হতাশ হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কারণ এই জুটি বিগত লোকসভা নির্বাচনে সারা ভারতে সফল হলেও এবার পশ্চিমবঙ্গে এসে ধাক্কা খেলেন। এদিকে বড় জয় পেলেও নন্দীগ্রামের ফল নিয়ে অস্বস্তির মুখে পড়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ এই আসনে সাবেক শীষ্য বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির। এক পর্যায়ে মমতাকে এই আসনে জয়ী ঘোষণা করা হয়। কিছু সময় পরই জানানো হয় মমতা নয়, জিতেছেন শুভেন্দু অধিকারী। এ নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর ভোট পুনর্গণনার বিষয়টি বিবেচনা করছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। ফলে এই আসনে জয়-পরাজয় নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। মমতা ব্যানার্জি এবার এই একটি আসন থেকেই লড়েছেন।
গত ২৯ এপ্রিল শেষ দফার ভোটগ্রহণের পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বুথ জরিপের ফল আসতে শুরু করে। এসব জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয় তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে চলেছে। তৃণমূল বা বিজেপির যে কেউ ক্ষমতায় আসতে পারে। আবার ঝুলন্ত বিধানসভাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে কিং মেকার হয়ে উঠতে পারে সিপিএম, জাতীয় কংগ্রেস এবং ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট নিয়ে গঠিত সংযুক্ত মোর্চা। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যে রায় দিয়েছেন তাতে সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
গতকাল সকালে ভোট গণনা শুরু হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে লড়াইটা ছিল সমানে সমান। তবে সময় যত গড়িয়েছে ততই তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান বেড়েছে। গতবার তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪ আসনের মধ্যে ২১১টিতে জিতেছিল। এবার তার চেয়েও বেশি আসনে জয় পেতে চলেছে। সব মিলিয়ে ভোট হওয়া ২৯২ আসনের মধ্যে ২১৫টিতেই জয় পেতে চলেছে তারা। তৃণমূলের হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, পার্থ চ্যাটার্জি, অরূপ বিশ্বাস, সুব্রত মুখার্জি, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, ইন্দ্রনীল সেন, জাভেদ খান, শশী পাঁজা, সুজিত বসু, সৌমেন মহাপাত্র, বিমান ব্যানার্জি, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, মলয় ঘটক, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক জয়ী হয়েছেন।
এছাড়া দলের তারকা প্রার্থীরা প্রায় সবাই জিতেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, বেচারাম মান্না, সোহম চক্রবর্তী, লাভলি মৈত্র, রাজ চক্রবর্তী, কাঞ্চন মল্লিক, মনোজ তেওয়ারি, অদিতি মুন্সী, জুন মালিয়া ও চিরঞ্জিত্ চক্রবর্তী। যদিও হেরেছেন, অভিনেত্রী সায়ন্তিকা বন্দোপাধ্যায় ও কৌশানি মুখোপাধ্যায়।
অন্যদিকে যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার জন্য জোর চেষ্টা চালিয়েছিল তারা পেতে চলেছে ৭৫টি আসন। নির্বাচনে বাবুল সুপ্রিয়, ?লকেট চ্যাটার্জি, সব্যসাচী দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, রুদ্রনীল ঘোষ, পায়েল সরকার, শ্রাবন্তী চট্টোপাধ্যায়ের মতো বিজেপির হেভিওয়েট ও তারকা প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন।
তৃণমূল ও অন্যান্য দল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে হেরেছেন—রাজিব ব্যানার্জি, জিতেন্দ্র তেওয়ারি, রথীন চক্রবর্তী, প্রবীর ঘোষাল, বৈশাখি ডালমিয়া, সব্যসাচী দত্ত, বিশ্বজিত্ রায় ও সুদীপ চ্যাটার্জি।
এবারের নির্বাচনে বদলে গেছে পশ্চিমবঙ্গের চিরায়ত রাজনৈতিক চিত্র। তিন দশকের বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। গত দুই বিধানসভায় তারা ছিল বিরোধী দল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে মোদি হাওয়ায় তৃণমূলের তেমন ক্ষতি না হলেও ধুয়েমুছে গেছে সিপিএম ও জাতীয় কংগ্রেস।
গণতন্ত্রের জয় হয়েছে :মমতা
এই জয়ের পর গতকাল মমতা ব্যানার্জি বলেন, বিজেপি ডাবল ইঞ্জিন সরকার চেয়েছিল। তার জবাব আমরা দিয়েছি ডাবল সেঞ্চুরি করে। পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মমতা বলেন, জয়ের জন্য সবাইকে অভিনন্দন। এটি বাংলার জয়, মানুষের জয়। বাংলা আজ ভারতকে বাঁচিয়েছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত হবে। কবে শপথগ্রহণ করা হবে, তা পরে জানানো হবে। তিনি তৃণমূল কংগ্রেস সমর্থকদের কোভিড পরিস্থিতিতে বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দেন।
মোদি, অমিত শাহের অভিনন্দন
পশ্চিমবঙ্গে আবারও নিরঙ্কুশ জয়ের জন্য মমতা ব্যানার্জিকে অভিনন্দন জানিয়ে টুইট করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। একই সঙ্গে মানুষের সমর্থনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানেরও প্রশংসা করেছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক টুইট বার্তায় পশ্চিমবঙ্গের মানুষের রায়কে সম্মান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে রাজ্যে বিজেপিকে শক্তিশালী করার জন্য ধন্যবাদও জানিয়েছেন।
তৃণমূলের এই নিরঙ্কুশ জয়ে মমতা ব্যানার্জিকে আরো অভিনন্দন জানিয়েছেন বিজেপি নেতা ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, শশী থারুর, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ ভারতের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতারাও।
ফল বিপর্যয়ের কারণ খুঁজছে বিজেপি
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটে বিজেপির বিপর্যয়ের কারণ জানতে চেয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গতকাল দুপুরে এ কথা জানান রাজ্য বিজেপির কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়। কার্যত ভোট গণনার মধ্যেই কৈলাস বিজেপির ভরাডুবি মেনে নেন। পাশাপাশি টালিগঞ্জে এমপি বাবুল সুপ্রিয় এবং চুঁচুড়ায় লকেট চ্যাটার্জির পরাজয়ের ঘটনাকে ‘আশ্চর্যজনক’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি জানান, ভোটের পূর্ণাঙ্গ ফল মেলার পর বিজেপি নেতৃত্বের তরফে পর্যালোচনা করা হবে। বিধানসভা ভোটের প্রচারপর্বে রাজ্যে এসে একাধিকবার ২০০ আসনে জেতার দাবি করেন বিজেপির সাবেক সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত। কিন্তু বিজেপি সেখানে ১০০ আসনও পায়নি। বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, আমরা লড়েছি। ফল পর্যালোচনা করা হবে। আমাদের নিশ্চয়ই কিছু ভুল হয়েছিল। কী হয়েছিল, তা নিয়ে মানুষের মতামত নেব।
অস্তিত্ব সংকটে সিপিএম ও কংগ্রেস
জাতীয় কংগ্রেস এবং সিপিএম পৃথকভাবে দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছে। সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল। সেই সিপিএম এবার বিধানসভা নির্বাচনে একটিও আসন পায়নি। ১৯৬৪ সালে সিপিআই ভেঙে আলাদা হওয়ার পর এটাই তাদের সবচেয়ে খারাপ ফল। এর আগে ১৯৭২ সালে তারা ১৪ আসন পেয়েছিল।
অন্যদিকে জাতীয় কংগ্রেস দুই দফায় ২৫ বছর পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় ছিল। এবার তারাও কোনো আসন পায়নি। এত খারাপ ফল ১৯৭৭ সালে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার সময়ও তাদের হয়নি।? এই জোটের একটি মাত্র আসন পেতে চলেছে সহযোগী দল আব্বাস সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (?আইএসএফ)?।
সিপিএম নেতা বিমান বসু বলেছেন, বিজেপিকে পরাজিত করতে মানুষ ভোট দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস লাভবান হয়েছে। কেন সংযুক্ত মোর্চার বিপর্যয়, তা পর্যালোচনা করতে হবে। অনুসন্ধান করে শিক্ষা নেব।
‘মুসলিমরা একজোট হয়ে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে’
বিশ্লেষকরা বলছেন, ডানপন্থি ও হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এই নির্বাচনে জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাতে মুসলিমরা একজোট হয়ে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। পক্ষান্তরে হিন্দু ভোটও তাদের পক্ষে গেছে। যা তৃণমূলকে নিরঙ্কুশ জয় এনে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে ২০১৬ সালে একক দল হিসেবে ২১১ আসন জিতেছিল তৃণমূল। এবার তা ছাড়িয়ে গেছে।
