প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় দুর্গত মানুষের পাশে আছে। করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তার পাশাপাশি দলীয়ভাবেও আমরা মানুষের পাশে আছি। কিন্তু অন্যরা কোথায়? যারা প্রতিদিন সরকার উত্খাতের জন্য বক্ততা-বিবৃতি দেয়, করোনা মহামারির এই দুঃসময়ে মানুষের পাশে তাদের দেখা যাচ্ছে না।’ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে বিরোধী দলগুলোর যারা সমালোচনা করছেন, মহামারির মধ্যে তারা নিজেরা কত জনকে সাহায্য করেছেন, সেই হিসাব পত্রিকায় দিতে বললেন তিনি।
গতকাল রবিবার গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিং পরিষেবার মাধ্যমে নগদ আর্থিক সহায়তা কার্যক্রমের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এই কার্যক্রমের আওতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঈদ উপহার হিসেবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিক, গৃহকর্মী, রিকশা ও ভ্যানচালক, মোটরশ্রমিকসহ কর্মহীন বিভিন্ন পেশার ক্ষতিগ্রস্ত সাড়ে ৩৬ লাখ পরিবার আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা পাবে। উদ্বোধনের দিনই ২২ হাজার ৮৯৫ জনের কাছে সহায়তার টাকা পৌঁছে গেছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে নগদ, বিকাশ, রকেট ও শিওরক্যাশের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে জিটুপি (গভর্নমেন্ট টু পার্সন) ভিত্তিতে টাকা পাবে বাকি পরিবার।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সর্বদা দেশের জনগণের পাশে থাকে। সেটা ক্ষমতায় বা বিরোধী দল যে অবস্থানেই থাকুক না কেন। করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ততটা উদ্যোগ তিনি দেখছেন না উল্লেখ করে বলেন, ‘অনেকেই শক্তিশালী বিরোধী দল চায়। আমরাও তো বিরোধী দলে ছিলাম। আমরা বিরোধী দলে থাকতে সব সময় যে কোনো দুর্যোগ-দুর্বিপাকে সবার আগে আওয়ামী লীগ ছুটে যেত মানুষের পাশে। এটাই বিরোধী দলের কাজ। কিন্তু আজকে যারা প্রতিদিন সরকার উত্খাতের জন্য বক্তৃতা-বিবৃতি দেয়, আন্দোলনের নামে পোড়াও-জ্বালাও করে যাচ্ছে, দুর্যোগে মানুষের পাশে কোথায় তারা? কয়টা দুর্গত মানুষের মুখে তারা খাবার তুলে দিয়েছে? কয়টা মানুষের পাশে তারা দাঁড়িয়েছে? কয় জন মানুষের কাফনের কাপড় কিনে দিয়েছে? কেউ নেই।’ সরকারের সমালোচকদের উদ্দেশে তিনি আরো বলেন, ‘নিজে কয়টা লোককে সাহায্য করেছেন, তার একটা হিসাব পত্রিকায় দিয়ে দেন। তাহলে মানুষ আস্থা পাবে, বিশ্বাস পাবে। সেটা হচ্ছে বাস্তবতা।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ করে দিয়েছে এবং অনেকগুলো বেসরকারি টেলিভিশন করে দিয়েছে, রেডিও করে দিয়েছে, পাশাপাশি বেসরকারি খাতে অনেকগুলো পত্রিকা হয়ে গেছে এবং তারা বেশ ঘরে বসে বসে বিবৃতিই দিয়ে যাচ্ছেন।’
কথিত বুদ্ধিজীবীদের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাদের বুদ্ধিটা যখন খোলে এবং তারা পরামর্শ দেন, তার আগেই কিন্তু আমাদের সরকার আওয়ামী লীগ এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে নেয়।’ সরকার যখন মানুষের কল্যাণে সব পরিকল্পনা গুছিয়ে আনে বা বাজেটে কোন কোন খাতের ওপর বেশি গুরুত্ব দেবে, তা যখন চূড়ান্ত হয়ে যায়, তখন সেই বুদ্ধিজীবীদের ‘দুই একটা বুদ্ধি খোলে’ বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের যেই কাজগুলো, সেইগুলো আবার তারা আমাদের পরামর্শ দেন। তো ঠিক আছে। তারা বুদ্ধিজীবী, তাদের এত বুদ্ধি, বুদ্ধি বেচেই জীবন যাপন করবেন। কাজেই তাদের পরামর্শের জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।’ সরকার বুদ্ধিজীবীদের পরামর্শের জন্য বসে না থেকে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারণ এই দেশটা আমাদের। এই দেশটা আমার বাবা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। রাজনীতি আমাদের জনগণের জন্য, জনগণের কল্যাণের জন্য। এই কথাটা আমরা ভুলি না।’
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে সমাজের বিত্তশালীদেরও এই দুর্দিনে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। পাশাপাশি দেশবাসীকে স্বাস্থ্যবিষয়ক নির্দেশনাগুলো মেনে চলার আহ্বান জানান। ভোলা, জয়পুরহাট ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে স্থানীয় এমপি, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও উপকারভোগীরা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে যুক্ত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সাড়ে ৩৬ লাখ পরিবারকে নগদ সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। ৬৪ জেলায় ইউনিয়ন হিসেবে করে জেলা প্রশাসকদের কাছে কিছু টাকা দিয়ে রাখা হয়েছে। কেননা, যে কোনো জায়গায় তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনে তারা যেন সেটা ব্যয় করতে পারেন এবং দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের অনুকূলে ১০ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া শিল্পী, কলাকুশলী থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদ্রাসায় অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ সময় তিনি করোনা মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করা, ভিড় এড়িয়ে চলাসহ স্বাস্থ্যবিধিগুলো যথাযথভাবে অনুসরণে জণগণের প্রতি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আরো বলেন, ঈদ উত্সব তো আছেই। এটা সবাই উদ্যাপন করবেন। কিন্তু স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। ঈদের আনন্দ করবেন। কিন্তু যারা মারা গেছে, তাদের কথাও ভাবুন। নিজের জীবন বিপন্ন করে উত্সব নয়।
প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস গণভবন থেকে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। সেখানে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এমপি, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়াসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
