কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়াকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলা করেছিলেন তার বোন। আর এখন তার ভাই হত্যা মামলার অভিযোগ নিয়ে গেলেন আদালতে। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় মুনিয়ার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া আসামি করেছিলেন বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরকে। অন্যদিকে মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ হত্যা মামলার আবেদনে আসামি করেছেন হুইপ শামসুল হক চৌধুরীর ছেলে চট্টগ্রাম চেম্বারের পরিচালক নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে।
এদিকে মামলা প্রত্যাহারের জন্য অব্যাহত চাপ ও প্রাণনাশের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে মুনিয়ার বোন ও আত্মহত্যা প্ররোচনার মামলার বাদী নুসরাত গত শনিবার কুমিল্লার কোতয়ালি থানায় নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে জিডি করেছেন। মুনিয়ার লাশ উদ্ধারের পাঁচ দিন পর গতকাল আশিকুর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা মামলার আবেদন নিয়ে যান। মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভুঁইয়া আবেদনটি নিলেও মুনিয়ার বোনের করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলার তদন্ত চলায় আপাতত এটির কার্যকারিতা স্থগিত থাকবে বলে জানিয়েছেন। আদালতের পেশকার মাসুদ পারভেজ বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে গুলশান থানায় একটি মামলা হয়েছে। ঐ মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন। এ মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত ৩০২ ধারার হত্যা মামলার আবেদনটি স্থগিত থাকবে।
হত্যা মামলার আবেদনে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাতে শারুন কীভাবে জড়িত ছিলেন, তার বিবরণ জানা যায়নি। এ বিষয়ে আশিকুরের কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তার আইনজীবী সালাউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। এমনকি মামলার প্রতিক্রিয়া জানতে শারুনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে মামলার প্রতিক্রিয়ায় শারুন গতকাল একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালকে বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ ইস্যুটিকে ভিন্ন খাতে নিতে আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আমি এ ঘটনায় সম্পৃক্ত নই। গত দেড় মাস ধরে চট্টগ্রামে আছি, আমি কীভাবে এ ঘটনায় জড়িত?’
কুমিল্লার বাসিন্দা ঢাকার এক কলেজের ছাত্রী মুনিয়াকে গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তার বোন নুসরাত কুমিল্লা থেকে এসে সেদিনই আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে গুলশান থানায় মামলা করেন।
একাধিক মোবাইল নম্বর থেকে বাদীকে হুমকি!
কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, মুনিয়ার বোন ও আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলার বাদী নুসরাত নিজের পরিবারের সদস্যদের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে অজ্ঞাত হুমকিদাতা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় শনিবার সন্ধ্যায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। জিডিতে নুসরাত অভিযোগ করেন, মামলা তুলে নিতে বা সমঝোতা করার জন্য কয়েকটি মোবাইল নম্বর থেকে তাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তিনি তার ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের আশঙ্কা করছেন এবং তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। জিডিতে চারটি মোবাইল নম্বরের উল্লেখ করা হয়। ঐ নম্বরগুলো ছাড়াও আরো বেশ কিছু নম্বর থেকে গত ২৮ এপ্রিল রাত থেকে ৩০ এপ্রিল রাত পর্যন্ত তাদের মামলা প্রত্যাহার বা সমঝোতায় আসার জন্য ফোন করা হয় বলে তিনি জানিয়েছেন।
জিডিতে নুসরাত উল্লেখ করেন, মামলা প্রত্যাহার করা না হলে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি ও নাজেহাল করাসহ টাকার বিনিময়ে খুন করে কিংবা যে কোনো অঘটন ঘটিয়ে লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো সময় তাকে অথবা তার স্বামীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের যে কোনোভাবে বিপদে ফেলা হবে এবং কুমিল্লায় অথবা কুমিল্লার বাইরে যাতায়াতের সময় তাদের জানমালের মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তিনি। নুসরাত আরো বলেন, ‘আমার বোনকে (মুনিয়া) হারিয়েছি। বিচার চাওয়ায় এখন আমি ও আমার স্বামীসহ পরিবারের সদস্যরা জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছি।’
জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন
এদিকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটন করে দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেফতার এবং মামলা প্রত্যাহারের জন্য বাদী ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদানকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে গতকাল দুপুরে কুমিল্লা নগরীতে পৃথক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও মহানগর আইনজীবী কল্যাণ পরিষদের ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। পৃথক এসব মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউল আহমেদ বাবুল, সাবেক পিপি মোস্তাফিজুর রহমান লিটন, অ্যাডভোকেট শহিদুল হক স্বপন প্রমুখ।
