নৌ-দুর্ঘটনা :টনক আর কবে নড়িবে?

আপডেট : ০৩ মে ২০২১, ২১:৪৭

মাদারীপুরের শিবচরে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌ-রুটের কাঁঠালবাড়ী ঘাটসংলগ্ন এলাকায় বাল্কহেডের (বালু টানা কার্গো) সঙ্গে স্পিডবোটের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াছে গতকাল সোমবার। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এই দুর্ঘটনায় ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হইয়াছে। এই দুর্ঘটনাটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুঃখজনক, ইহাতে কোনো সন্দেহ নাই। দুর্ঘটনায় যাহারা প্রাণ হারাইয়াছেন, তাহাদের জন্য আমরা গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই; কিন্তু এই নৌ-দুর্ঘটনাটি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়াছে। সারা দেশে এখন করোনা মহামারি পরিস্থিতির কারণে লকডাউন চলিতেছে। লকডাউনে সড়কপথে গণপরিবহনের পাশাপাশি নৌপথেও লঞ্চ, স্টিমার, স্পিডবোট ইত্যাদি চলাচল বন্ধ রহিয়াছে। এই অবস্থায় নৌ-দুর্ঘটনা কীভাবে ঘটে? একশ্রেণির অসাধু স্পিডবোট চালক কীভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় অবৈধ উপায়ে যাত্রী পারাপার করিয়া আসিতেছে? তাহারা নিষেধাজ্ঞাকে কেন পরোয়া করিতেছে না? জানা যায়, গতকাল সকাল ৭টার দিকে মুুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট হইতে ৩১ জন যাত্রী লইয়া স্পিডবোটটি মাদারীপুরের শিবচরের বাংলাবাজারের দিকে যাইতেছিল। স্পিডবোটটি কাঁঠালবাড়ী পুরাতন ফেরিঘাটের নিকটে আসিলে নদীতে থাকা একটি বাল্কহেডের পিছনে সজোরে ধাক্কা লাগিয়া উলটাইয়া যায়। স্পিডবোটের চালককে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হইয়াছে। বর্তমানে তিনি চিকিত্সাধীন। আমরা আশা করি, এই ব্যাপারে গঠিত তদন্ত কমিটি দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করিয়া শিগিগরই রিপোর্ট প্রদান করিবে এবং তাহার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করিবেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

এখানে লক্ষণীয় যে, ইতিপূর্বে বিভিন্ন নৌ-দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যেই সকল তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে, তাহার অনেক রিপোর্টই শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয় নাই। আবার গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দুর্ঘটনায় তদন্ত কমিটির রিপোর্ট আলোর মুখ দেখিলেও তাহার সুপারিশ আমলে নেওয়া হইয়াছে—এমন নজির খুবই কম। ফলে এই সকল তদন্ত কমিটির প্রতি মানুষের আস্থা বলিতে গেলে নাই বলিলেই চলে। এখানে বড় যে প্রশ্নটি আমাদের সম্মুখে দেখা দিয়াছে তাহা হইল, নৌ-দুর্ঘটনার পিছনে যেই সকল কারণ রহিয়াছে, সেই সকল কারণ জানিবার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন এই ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতেছে না? দেখা যায়, অনেক নৌযানের রেজিস্ট্রেশন নাই। রেজিস্ট্রেশন ছাড়া একটি নৌযান কীভাবে নৌপথে চলাচল করে? নৌ-পুলিশের তাহলে দায়িত্ব কী? শুধু তাহাই নহে, বাস-ট্রাকের ন্যায় অনেক স্পিডবোট বা লঞ্চচালকের নাই লাইসেন্স। নৌযানের নাই ফিটনেস সার্টিফিকেট। এইগুলি ছাড়া নদীপথে কোনো নৌযানের চলাচল করিবার কথা নহে; কিন্তু সকল সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশে যেন সকলই সম্ভব! দুর্ঘটনা ঘটিবার পর কিংবা গণমাধ্যমে কোনো খবর প্রকাশিত হইবার পরই কেবল আমাদের টনক নড়ে। কিছুদিন ইহা লইয়া আলোচনার ঝড় উঠে। আমরা সংবাদপত্রে ইহা লইয়া নিন্দা প্রকাশ করি। তাহার পর যেইকার সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়। মানুষ আবার দুর্ঘটনায় কবলিত হয়। শুনা যায় হতাহত ব্যক্তি ও তাহার আত্মীয়স্বজনের আহাজারি। এই সাময়িক হা-হুতাশ করা এবং কিছুদিনের মধ্যেই তাহা বেমালুম ভুলিয়া যাওয়াকে রসিকতা ছাড়া আর কীই-বা বলা যায়!

দেশে একের পর এক নৌ-দুর্ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে। এই সকল নৌ-দুর্ঘটনায় ব্যাপক সম্পদ ও প্রাণহানি মানিয়া লওয়া যায় না। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চৈতন্যের উদয় হউক। এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত এক বত্সরে ৫০টি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। আর ১৬ বত্সরে নৌ-দুর্ঘটনায় নিহত হইয়াছে ১ হাজার ৮২২ জন, নিখোঁজ ৮৬৪ জন। এই সকল দুর্ঘটনায় যে বা যাহারা দোষী বা দায়ী তাহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা লওয়া হউক। ইহাকে কেবল নিয়তি হিসাবে দেখা উচিত নহে। নৌপথের সুরক্ষাকে অবহেলা প্রদর্শনেরও কোনো সুযোগ নাই। বরং নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করিতে সর্বাত্মক উদ্যোগ লইতে হইবে। নৌপথে স্থাপন করিতে হইবে পর্যাপ্ত সাইন-সিম্বল। বিরূপ আবহাওয়ায় সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যবস্থারও উন্নতি হওয়া প্রয়োজন।