আর কিছুদিন পরেই ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে। বাজেট নিয়ে সরকারের প্রস্তুতি অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। এবারের করোনাকালীন বাজেট কেমন হতে যাচ্ছে, এ নিয়ে দেশের অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে চলছে নানা জল্পনাকল্পনা। ২০২১-এর বাংলাদেশ আজ অন্যরকম এক বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বনেতাদের কারো কারো মতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ‘তেজি ষাঁড়’, কারো মতে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’, কারো মতে অফুরন্ত ‘সম্ভাবনার এক বাংলাদেশ’।
স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীতে আমরা অন্যরকম এক বাংলাদেশকে দেখছি। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে বিশ্বব্যাপী করোনা অতিমারির ফলে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলেও গত বছর বাংলাদেশ অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল বলে আপাতদৃষ্টিতে অনেকেই মনে করেছেন। করোনা মোকাবিলা সক্ষমতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম ও বিশ্বে ২০তম স্থানে ছিল। এটা সম্ভব হয়েছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে অভাবিত উন্নয়নের ফলে। গত বছরের শেষের দিকে করোনার প্রকোপ বেশকিছুটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু এ বছরের মার্চ মাস থেকে অর্থাত্ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আমাদের আচরণগত কারণে এ বছরের মার্চ মাস থেকে আবার তীব্র আকার ধারণ করেছে। আমরা অনেকেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি না, মাক্স ব্যবহার করি না। বাইরে ঘোরাফেরায় সতর্কতা অবলম্বন না করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। করোনার তীব্রতা এবং ভয়াবহতা উপলব্ধি করে সরকার পুনরায় লকডাউনে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে করে দেশের অর্থনীতি আবার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে। মৃত্যুর মিছিল থামছেই না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চলার কারণে করোনার প্রকোপ মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। এ অবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য সংক্রমণ রোধে সরকার গত ১৪.০৪.২১ তারিখ রোজার প্রথম দিন থেকেই এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় আরো আগামী ১৬ মে পর্যন্ত এ মেয়াদ আরো বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু এ লকডাউনের বিধিনিষেধ নিম্ন আয়ের মানুষরা মানতে চাইছে না। জীবন-জীবিকার তাগিদে তারা ঝুঁকি নিয়ে বের হচ্ছে।
একদিকে বেকারত্ব অন্যদিকে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ২০১৯ সালে দেশে ২০.৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে ছিল। কিন্তু বিভিন্ন হিসাবে তা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। অর্থাত্ করোনার কারণে নতুন করে ১০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের যৌথ উদ্যোগে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিডের আঘাতে দেশে নতুন করে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। করোনা মোকাবিলায় ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছিল সেগুলো সুষ্ঠু বণ্টন হয়নি। বিশেষ করে, ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতে যে প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল তার মাত্র ৪০ ভাগ বিতরণ হয়েছে বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনার মধ্যে ১৪ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বিতরণ করেছে সরকারি বেসরকারি ব্যাংকগুলো। সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা এখনো বিতরণ হয়নি। করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানসমূহ। আর সে কারণেই সরকার এ প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে এ খাত। সরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএসের তথ্যমতে, মোট দেশজ উত্পাদনের বা জিডিপির শতকরা ২৫ ভাগ আসে এ খাত থেকে। শুধু তা-ই, নয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সমীক্ষা অনুসারে দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প খাতের মাধ্যমে। এ ছাড়াও আমাদের দেশে শ্রমবাজারে এমনিতেই নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কম তার ওপর করোনা অতিমারির কারণে নারী শ্রমিকরা চাকরি হারিয়ে নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ক্ষুদ্র, মাইক্রো ও মাঝারি খাতে মোট ঋণের ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণের নির্দেশনা থাকলেও এ নির্দেশনা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। গত বছর বিতরণ করা ঋণের মাত্র ৩.৫১ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের।
আমাদের দেশের অর্থনীতি আবর্তিত হয় বিশেষ বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে। পহেলা বৈশাখ, রমজান, ঈদ ইত্যাদি উপলক্ষ্যে প্রচুর বেচাকেনা, বাজার সমাগম হয়। নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষগুলো চাঙ্গা হয়ে উঠে তাদের আয়-রোজগার বাড়ানোর জন্য। বিশেষ দিনগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন পণ্যে ভরে যায় শপিংমলগুলো। এক কথায় বাজার গতিশীলতা পায় এবং চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কিন্তু গতবারের মতো এবারের পরিস্থিতিও খারাপ। পূর্বের কর্মহীন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে কর্মহীনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক অশনিসংকেত দেখা দিয়েছে।
করোনায় কর্মহীন জনগোষ্ঠী নিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের গবেষণা থেকে জানা যায়, করোনার প্রভাবে এক বছরে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে দেড় কোটি। গবেষণায় দেখানো হয়েছে দেশে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে ৬ কোটি ৮২ লাখ ৮ হাজার মানুষ কর্মে নিয়োজিত ছিলেন। শুধু লকডাউনের কারণে কর্মহীন হয়েছেন ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭১ জন। অর্থাত্ মোট কর্মগোষ্ঠীর ৫৯ শতাংশ মানুষই কর্মহীন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকার হয়েছে সেবা খাতে। এ খাতে ১ কোটি ৫৩ লাখ কর্মী চাকরি হারিয়েছে। এদের মধ্যে ৬১ লাখ বেকার হয়ে পড়েছেন। কৃষি খাতে কাজ হারিয়েছে ১ কোটি ১৪ লাখ মানুষ। শিল্প খাতে প্রায় ৯৩ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের হিসাবে সারা দেশে ৪০ লাখ পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে লকডাউনের কারণে ইতিমধ্যে কয়েক লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে, যারা দিনভিত্তিক মজুরি পান। কাজ বন্ধ হওয়ার কারণে ভয়াবহ আর্থিক সংকটে পড়া এসব মানুষের ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে সরকারের চলতি বছরের প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ৭.৪ শতাংশ অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছরে করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দুটোই বেশি।
এ অবস্থা চলতে থাকলে উত্পাদনব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই সরকারকে এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। এবারে বাজেটে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য নতুন নতুন খাত চিহ্নিত করে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে স্বল্প পুঁজিতে অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে মাইক্রো, কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের উন্নয়নে বিশেষ নজর দিতে হবে।
n লেখক: অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক
