অণুগল্প

গালিবাজ জনু বক্স

আপডেট : ০৪ মে ২০২১, ২০:৫৩

হে খালি গাইল্যায়। মুখ করে। খুব খরাফ মানুষ।

কথাগুলো বলছিল আমান মাঝি। আমান মাঝিকে ঘিরে থাকা জনা দশেক মানুষও ‘অয়’ ‘অয়’ করে নির্দ্বিধায় সম্মতি প্রকাশ করল। ভিড়ের মধ্য থেকে একজন বলল, জনু বক্স মানুষডা খরাফ আছিন না, অভাবে ফইর্যা মানুষডার মাথা বেঠিক অইয়া গেছে। না ফায় খাওন, না ফায় কাফর। মাইয়াডারে বিয়া দিয়াই শান্তি অইলো না, পোলাডাও গেছে আগলা অইয়া।

আমান মাঝি বলল, আমি তো হেরে চিনি ছোটবেলা থাইক্যা। ওর স্বভাবই এমুন। ছোটবেলা থাইক্যাই খুব মুখ করত। হের মুখই খরাফ। 

সমবেত মানুষেরা ঐক্যমত্যে পৌঁছায় এবং জনু বক্সের গালিগালাজ স্বভাবের জন্য তাদের মধ্যে ঘৃণাবোধ জেগে ওঠে।

এই সংসারে সব মানুষের স্বভাব তো আর একরকম হয় না। মানুষের যে কোনো দক্ষতাকেই কাজে লাগানোর পাকা ব্যবস্থাও আছে। গ্রামের বিটকেলে বাদশা মিয়া তামাশা করার জন্য জনু বক্সকে কাজে লাগায় বেশ বুদ্ধি করে। উঁচু জাঙ্গালে দাঁড়িয়ে জনু বক্স যদি একনাগাড়ে দশ মিনিট গালিগালাজ করতে পারে তবে তাকে একশো টাকা দেওয়া হবে। পঞ্চাশোর্ধ্ব জনু বক্স খুশিমনে রাজি হয়ে গেলেও পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করল, কারে গাইলাইবাম? নাম কও।

বাদশা মিয়া ভাবান্তরে পড়ে, কাকে গালি দেবে? কিন্তু গালি নৈর্ব্যক্তিক হওয়া উচিত ভেবে সে বলল, ঘুসখোরদের গাইলাইবি।

কথামতো জনু বক্স উঁচু জাঙ্গালে গিয়ে দাঁড়িয়ে ঘুসখোরদের একটানা দশ মিনিট অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। ফসলের মাঠে কর্মরত মানুষেরা তার গালিগালাজ শুনে কেউ জয়ধ্বনি দেয়, কেউ কেউ মুখ টিপে হাসে। দশ মিনিট গালিগালাজ করে একশো টাকা পেয়ে জনু বক্স ফুরফুরে মনে বাজার করে বাড়ি ফিরে। ঘটনাটি এ পর্যন্ত হলেও চলত। কিন্তু জনু বক্সের গালিগালাজ করার কাজটি কিছুদিনের মধ্যে পেশায় পরিণত হয়ে যায়। এবং বিভিন্ন গ্রাম থেকে লোকজন এসে তাদের প্রতিপক্ষকে গালি দেওয়ার জন্য জনু বক্সকে হায়ার করে। জনু বক্সও উপার্জনের একটা উপায় পায়।

মানুষের সব দিন তো একরকম যায় না। একদিন গ্রামের একরামের একটি ষাঁড় দড়ি ছিঁড়ে মানুষের দৃষ্টির অগোচরে চলে যায়। বাদশা মিয়ার খেসারি-কলাইয়ের খেতে কলাইয়ের যে পরিমাণ ক্ষতি করেছে তা দেখে বাদশা মিয়ার মাথায় আগুন লেগে যায়। ঐ বেলাতেই জনু বক্সকে দুই শ টাকা দিয়ে হায়ার করে একরামকে কুড়ি মিনিট গালিগালাজ করতে বলল। যে কথা সে কাজ। উঁচু জাঙ্গালে দাঁড়িয়ে জনু বক্স অশ্রাব্য অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে যে গালি একরামের কান পর্যন্ত পৌঁছায়। একরাম ইচ্ছে করলে জনু বক্সকে থাবড়িয়ে কানের পর্দা ফাটাতে পারত এই ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু সে নিজের ক্ষমতা না দেখিয়ে আদালতের আশ্রয় নেয়।

গরিব মানুষ বলে জনু বক্সকে বাঁচানোর দায় গ্রামের অনেকের। আক্ষেপ ও মমতায় তার পক্ষ নিয়েছে অনেকেই। বাদশা মিয়ার গাঁটের টাকা খরচ করে উকিলও ধরেছে। মামলা-মোকদ্দমার বিধি-বিধান অনুযায়ী শুনানি হয়। জনু বক্সের উকিল কাবিল হাসান তর্কে সেরা, মামলা জয়েও ইতিহাস। তিনি বললেন, জনু বক্সের বাক-স্বাধীনতাকে হরণ করা অসাংবিধানিক কাজ। তাঁকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক।

বিজ্ঞ আদালত রায় দিলেন জনু বক্সের ছয় মাসের জেল। পর্যবেক্ষণে লিখলেন, বাক-স্বাধীনতার মানে এই নয় যে অন্য নাগরিককে গালিগালাজ করে অতিষ্ঠ করা। কোনো সভ্য সমাজে এরকম বাক-স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দিতে পারে না।