মানুষ যাহা অর্জন করেন, তাহা কেন করেন? কীভাবে করেন? মনে রাখিতে হইবে, আমাদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন সামর্থ্য ও অর্জনের ক্ষমতা রহিয়াছে। মহান সৃষ্টিকর্তা কাউকে তাহার সাধ্যের বাহিরে কোনো কাজ চাপাইয়া দেন না। তিনি জানেন আমাদের সাধ্য কতখানি এবং সেই অনুসারে তিনিই নির্ধারণ করিয়া দেন। সুতরাং যাহা বহিবার সামর্থ্য আমাদের নাই, সৃষ্টিকর্তা সেই দায়িত্ব আমাদের উপর অর্পণ করেন না। এই জন্য মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলিয়াছেন—‘অর্জনের মূল্য অর্জনের মধ্যেই নিহিত।’ সুতরাং স্পষ্ট করিয়া বলা যায়, মহান সৃষ্টিকর্তাই আমাদের সম্মান প্রদান করেন; কিন্তু আমরা কি কখনো ভাবিয়া দেখিয়াছি, কেন তিনি সম্মান দেওয়ার পর কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাহা আবার ফিরাইয়া নেন? ইহা বুঝিতে হইলে প্রথম নিজেকে জানিতে হইবে, নিজেকে বুঝিতে হইবে। সেই যে আড়াই সহস াধিক বত্সর পূর্বে গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বলিয়া গিয়াছেন—‘নো দাইসেলফ’, নিজেকে জানো—সেই নিজেকে জানার নিরন্তর চেষ্টা মানুষকে আমৃত্যু করিয়া যাইতে হয়। হাদিসেও বলা আছে—যে নিজেকে জানিল, সে তাহার রবকে জানিল। স্পষ্টতই, নিজেকে না চিনিলে সৃষ্টিকর্তাকেও চিনা যায় না। আবার নিজেকে চেনার ভিতর দিয়া সৃষ্টিকর্তার মহিমা উপলব্ধি করা যায়।
নিজেকে না জানিতে পারিবার মধ্যে যেমন মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি ও ক্রিয়াকলাপকেও কিছুটা অনুধাবন করা যায়, তেমনি নিজেকে জানিতে না পারিলে কিছু অর্জন করিবার পর তাহা যদি হারাইতে হয়, তাহার কারণও অনুধাবন করা যায় না। অর্থাত্ নিজেকে না জানা সবচাইতে বড় অজ্ঞতা। এই অজ্ঞতার শাস্তিস্বরূপ অনেকে জুজুর ভয় পান। যিনি জুজুর ভয় পান; তিনি জানেনই না যেই জুজুর ভয় তিনি পাইতেছেন, তাহার আদৌ কোনো অস্তিত্ব নাই। আমরা যদি নিজেকে না জানি এবং চিনি, তাহা হইলে আত্মবিশ্বাসের সহিত আমাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করিব কী করিয়া? আমরা যদি কোনো সম্মান অর্জন করি, সেই সম্মান ধরিয়া রাখিবার দায়িত্ব আমাদেরই। এইভাবে নিজের জীবনাচরণ ও কর্মসম্পাদন এবং অর্পিত দায়িত্ব পালন করিতে হইবে, যাহাতে কেহ যেন আড়ালে গালি দিতে না পারে। এই ক্ষেত্রেও সকলের প্রথমে নিজেকে চিনিতে হইবে। ইহার সহিত ভালোবাসিতে হইবে নিজেকে। মহামতি গৌতম বুদ্ধ এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন যে, ‘নিজেকে তো বটেই মহাবিশ্বের কেহ যেন আপনার অনুগ্রহ ও ভালোবাসা হইতে বঞ্চিত না হয়।’ কথিত আছে, কেহ যদি কোনো খেলার নিয়ম সবচাইতে ভালোভাবে জানেন, তবে তিনি সেই খেলাটি ভালো খেলিতে পারিবেন। একইভাবে জগতের নিয়ম রহিয়াছে। সৃষ্টিকর্তার নিয়মের বাহিরে কিছু হয় না। আমাদের অর্জনগুলি সেই নিয়মের মধ্যেই হইয়া থাকে। সুতরাং আমাদের হূদয় দিয়া অনুভব করিতে হইবে স ষ্টার বার্তা। এই ক্ষেত্রে অন্যরা আমাদের সম্পর্কে কী ভাবিতেছেন উহা লইয়া আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত নহে। আমরা কি আমাদের নিজস্ব মতামতগুলির চাইতে অন্যের মতামতের প্রতি অধিক আস্থা রাখিতে পারি?
সুতরাং আমাদের নিজের জীবনের সংজ্ঞা কাহারো নিকট হইতে গ্রহণ করিবার কোনো মানে হয় না। বরং নিজেই নিজেকে সংজ্ঞায়িত করিতে হইবে। আর ইহার জন্যই সর্বপ্রথম জানিতে হইবে নিজেকে। ইহার পাশাপাশি সময়ের কাজ যথাসময়ে করিতে হইবে। সঠিক কাজটি করিবার সঠিক সময় যদি আপনার হাতে না থাকে, তাহা হইলে কাজটির প্রয়োজন ফুরাইবার পর কি আপনার ‘সময়’ হইবে? তখন কি ঐ সময়ের আর কোনো মূল্য থাকিবে? ফকির লালনের বাণীটি ভুলিলে চলিবে না—‘সময় গেলে সাধন হবে না।’
