বেগম কামরুন নাহার জাফর
বাংলাদেশ আজ জাগ্রত সত্য। আক্রান্ত হয়ে আমরা সংগ্রাম করেছি, জাতিকে ধ্বংস ও সর্বনাশের হাত থেকে বাঁচাতে সংগ্রাম আমাদের করতে হয়েছে। প্রথম আক্রমণের ধাক্কায় বর্বর, পাকিস্তানি বাহিনী বাংলার অনেক স্থান দখল করে নিয়েছিল। শুধু মুক্তি বাহিনী নয়—বাংলার সাধারণ নাগরিকদের ওপর চরম আঘাত তারা হেনেছিল। আমাদের তরুণদের দুরন্ত সাহস, বজ্রকঠিন মনোবল, দৃষ্টান্তহীন আত্মত্যাগ পাকিস্তানি বাহিনীর সে প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। ইতিহাসের পাতায় সংযোজিত হয়েছে স্বাধীনতা।
আমাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ দলই এ সংগ্রামের হোতা। তাদের সীমিত বন্ধুবান্ধব অথবা আত্মীয়স্বজন ছাড়া এ প্রাণ-উত্সগুলোর সন্ধান কেউ রাখেনি। কিন্তু লগ্ন যখন এলো, চরম পরীক্ষার সম্মুখীন যখন হতে হলো, তখন প্রাণের বিপুল জাগরণ ঘটাল। এমনি দুঃসাহসী মুক্তিপাগল যোদ্ধাদের একজন চট্টগ্রামের ‘শহিদ ফরহাদ’। যারা তার বীরত্বের কাহিনি জানেন তাদের কাছে তিনি মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রাণপুরুষ।
মুখে মিষ্টি হাসি, প্রকাণ্ড ললাট, খেলোয়াড়ের দৃপ্ত বেপোয়ারা ভঙ্গি, আত্মবিশ্বাসী সমুজ্জ্বল এই তরুণই ফরহাদ—ফরহাদুদৌলা মোহাম্মদ এজহারুল ইসলাম। কাঁধে ঝোলানো সেমি অটোমেটিক রাইফেল, এক পকেট ভরা তার হাতবোমা আর এক পকেটে দুরবিন—এই নিয়ে এগিয়ে চলেছে যোদ্ধা ফরহাদ। এ স্বল্প জীবন পরিধিতে এত দুঃসাহস; এত স্থির সংকল্প তিনি অর্জন করেছিলেন—ভাবতেও কেমন লাগে!
মুক্তিযুদ্ধ না ঘটলে তাকে আমরা বড়জোড় প্রখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবেই জানতাম। ফুটবল খেলাতেই তার দক্ষতা ছিল। চট্টগ্রামের প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগের নওজোয়ান ক্লাবের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন। স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। অমিত সাহস ও আত্মত্যাগের অতুলনীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন ফরহাদ।
বাঁশখালীর অবসরপ্রাপ্ত জেলা বন অধিকর্তা খান সাহেব রফিক আহমেদ চৌধুরীর তৃতীয় পুত্র ফরহাদ। তার জন্ম ১৯৪৬ সালে। ইউওটিসির পূর্ণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফরহাদ ইতিহাসে এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষার্থী ছিলেন। দক্ষতার সঙ্গে বন্দুক চালনা এবং খেলাধুলাতেই ছিল তার প্রবল আসক্তি। অকুতোভয় ফরহাদের বিভিন্নমুখী প্রতিভা বিকাশের অপেক্ষায় ছিল। জীবনের চরম মূল্য দিয়ে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসাকে তিনি অম্লান করে রেখেছেন।
একাত্তরের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর বজ্রকঠিন আহ্বানে পাকিস্তানি সেনাদের সম্ভাব্য আক্রমণের প্রতিরোধ প্রতিষ্ঠিত হলো চট্টগ্রামে। আওয়ামী লীগের কতিপয় কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও যুবকবৃন্দ সুপরিচিত চক্ষু চিকিত্সক ডা. আবু জাফরের দেব পাহাড়ের বাসভবনে মিলিত হলেন। উদ্দেশ্য অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, বোমা ইত্যাদি সংগ্রহ করা। ফরহাদ এবং তার ক্যাডেট সঙ্গীরা এই দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ৯ মার্চ থেকে দিনরাত অবিরাম পরিশ্রম করে গেছেন। ইতিমধ্যেই ইস্টার্ন রিফাইনারি, টিএসপি, প্ল্যান্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিসিএসআইআর পরীক্ষাগারে প্রচুর পরিমাণ হাতবোমা, মলোটড ককটেল এবং বহুবিধ বিস্ফোরক দ্রব্য প্রস্তুত হতে থাকে। বিভিন্ন উপকরণ সংগ্রহ ও সমগ্র দলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে ফরহাদকে বিভিন্ন স্থানে ছুটোছুটি করতে হতো।
অবশেষে এলো ২৫শে মার্চের কালরাত্রি। বীর যোদ্ধা ফরহাদ ঘরের বন্ধন ছেড়ে সশস্ত্র মুক্তির সংগ্রামের পথে পা বাড়ালেন। টাইগারপাসের নৌবাহিনীর দপ্তর আক্রান্ত হলো। বিরতিহীন ১৮ ঘণ্টা স্থায়ী সে যুদ্ধে ফরহাদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বহু সেনা প্রাণ হারায়। ফরহাদ তার ডান হাতে আঘাত পান। ২৮ মার্চ মাদারবাড়ীতে মুক্তি বাহিনী গঠিত হলো। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সে সময় ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে সাধারণের সঙ্গে মিশে গিয়ে গ্রামের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। মাদারবাড়ীতে এমনি কয়েকটি দল প্রতিহত হলো। ফরহাদের নেতৃত্বে দেব পাহাড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গঠিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় হাটহাজারী এলাকা থেকে ২ এপ্রিল ফরহাদের ডাক এলো। এরপর থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. মল্লিকের নির্দেশে ফরহাদ নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। কখনো সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে, কখনো পাহারারত পর্যবেক্ষণের কাজে, কখনো-বা বিশেষ জরুরি সংবাদ বাহক হিসেবে। শিয়াল বুক্কার কাছে প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর ৮ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাদের ১৪ জনের সম্পূর্ণ দলটি ধরা পড়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুুল আজিজ শেখ, মেজর ইকবাল, এক জন ফ্লাইট লেফটেনেন্ট, দুই জন পাকিস্তানি জেসিও এই বন্দিদের অন্যতম। অনেক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ ফরহাদ ও তার দলের হাতে আসে এবং তা রামগড়ে পাঠানো হয়।
১৩ এপ্রিল মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দলকে দোহাজারী আনতে ফরহাদকে বান্দরবান যেতে হয়। ইতিমধ্যে বেশির ভাগ মুক্তিযোদ্ধাই চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। অবশিষ্ট ইবিআর ও ইপিআর এবং কিছুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে দুলাহাজারা ও কক্সবাজার এলাকার একটি মুক্তিসংগ্রামী দল গঠন করেন ফরহাদ। দোহাজারী থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ছুটোছুটি করে তিনি প্রায় ২০০ জন যোদ্ধা সংগ্রহ করেছিলেন।
তিনি খবর পেলেন কক্সবাজারে একটি গ্যারেজে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা আছে। ২৪ এপ্রিল একটি দুঃসাহসিক অপারেশনের মাধ্যমে সেগুলো ট্রাকবোঝাই করে ফরহাদ ক্যাম্পে নিয়ে এলেন। ইতিমধ্যে খবর এলো কক্সবাজার আনসার ক্যাম্পে এলএমজি, মর্টার ও মর্টার বোমা মজুত রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী অস্ত্রগুলো নিতে ফরহাদ ও কয়েক জন মুক্তিযোদ্ধা আনসার ক্যাম্পে যান ২৫শে এপ্রিল। অস্ত্রগুলো হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া চলাকালে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ফরহাদ ও তার দুজন মুক্তিযোদ্ধাকে আহত করে ফেলে। মুহূর্তেই সেখানে শান্তি কমিটির আহ্বায়ক মঈদুর রহমান চৌধুরী এবং কক্সবাজার এসডিও শহীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পুলিশ ফরহাদ ও তার সঙ্গীদের বন্দি করে ফেলে। এই পাতানো ফাঁদের ব্যাপারে ফরহাদের অজানা ছিল।
স্থানীয় দালালদের আমন্ত্রণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ৫ মে কক্সবাজার প্রবেশ করে। দালালরা ফরহাদ ও তার সঙ্গীদের উপঢৌকন হিসেবে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়। এই বীর বন্দিদের ভাগ্য নিরূপিত হয়ে গেল চিরতরে, সমুদ্রের বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে তাদের ব্রাশফায়ার করা হলো। অলৌকিকভাবে ফরহাদের বাম বাহু ভেদ করে গুলি চলে গেল কিন্তু ফরহাদের মৃত্যু হলো না। প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ফরহাদ মৃতের ভান করে পড়ে রইলেন।
রাতের গভীরতা নেমে এলো। হাত দুখানা পেছনে বাঁধা, প্রবল রক্তাক্ত অবস্থায় ফরহাদ হামাগুড়ি দিয়ে গণকবর থেকে বেরিয়ে এলেন। আহত অবস্থায় মাইল খানেক মাত্র এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন তিনি। অবসন্ন ফরহাদ বাঘখালী নদীর তীরবর্তী এক গ্রামের মসজিদে আশ্রয় নিলেন। ভোরের অস্পষ্টতা কাটেনি তখনও। মুয়াজ্জিন দেখতে পেয়ে তাকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করলেন। মসজিদে ফরহাদের দেহ নির্গত রক্তধারায় গোপনীয়তা ফাঁস হয়ে যায়।
দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এ খবর—গ্রামে, শহরে সবখানে। সেই মঈদুর রহমান চৌধুরী এবং এসডিও শহীদ চৌধুরী দ্রুত বেগে হাজির হয়ে আহত মুক্তি সৈনিক ফরহাদকে পুনরায় বন্দি করে কক্সবাজার নিয়ে যায়।
এক পিশাচ পাকিস্তানি মেজর তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বলতে থাকে ‘শালা মুক্তি বাহিনীর বাচ্চা, তুমি কবর থেকেও দেখছি বেরিয়ে এসেছ। এবার সমুদ্রেই তোমার গোর রচিত হবে। যেমন কথা, তেমন কাজ। হাত-পা ও চোখ বাঁধা অবস্থায় ফরহাদকে এবার নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। নিক্ষেপ করা হলো তার পবিত্র লাশ অতল সমুদ্রে, সেই প্রশান্তির সীমাহীন গভীরতায়। ১৯৭১ সালের ৬ মে চিরতরে নিভে গেল দেশমাতৃকার উত্সর্গকৃত তরুণ ফরহাদের প্রাণ। তার পরিচয় এখন শহিদ ফরহাদ।
n লেখক :সাবেক এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী, ফরহাদের বড় বোন
