বাঁধন হায়দার
স্যার, আমার পরীক্ষার প্রবেশপত্রটি দেন। শিক্ষক বললেন, ‘আগামীকাল যার এমএ ফাইনাল পরীক্ষা সে আজ এসেছে প্রবেশপত্র নিতে, যাও তোমার প্রবেশপত্র দেওয়া হবে না! কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তত্কালীন প্রধান। আগামীকাল তার পরীক্ষা কিন্তু তার কিছুই পড়া হয়নি। সে চিন্তা করল আর মনে মনে ভাবল, আজ সারা রাত তাকে পড়তে হবে। শিক্ষক কোনোভাবেই তাকে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেবে না কিন্তু সে পরীক্ষা না দিলে এবং পরীক্ষায় ফেল করলে তার একটি বছর নষ্ট হবে, একটি বছর পিছিয়ে পড়বে। শিক্ষক বললেন, তুমি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কী করবে, তুমি তো ফেল করবে আর বাংলা বিভাগের দুর্নাম হবে। শিক্ষকের কথাগুলো তার মনে খুব লাগল। তখন তিনি বললেন—স্যার, যদি একজন পরীক্ষার্থী এই পরীক্ষায় পাশ করে এবং ভালো রেজাল্ট করে সেই একজন পরীক্ষার্থী আমি। শিক্ষক হেসে দিয়ে বললেন, তুমি কি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছো? পরীক্ষার্থী বললেন, স্যার, এটা চ্যালেঞ্জ নয় কিন্তু এটাই সত্যি। শিক্ষক বললেন, আচ্ছা ঠিক আছে দেখা যাক কী হয়!
প্রবেশপত্রটি নিয়ে দৌড়ে চলে গেল তার মহসিন হলের রুমে। কিন্তু তার রুমে এতগুলো ছেলে তারপর তার লেখা পোস্টার, ব্যানার, এত এত রাজনৈতিক বই কোথাও বসে পড়ালেখা করার মতো জায়গা নেই। তার কাছে তার পাঠ্যবইও নেই। সে তার বড় ভাইদের কাছ থেকে নোট জোগাড় করে অন্য আরেকটা রুমে চলে গেল এবং সেই রুমে সে সারা রাত না ঘুমিয়ে পড়ালেখা করল এবং পরের দিন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল।
পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করার দিন বাংলা বিভাগীয় প্রধান তাকে তার রুমে ডেকে পাঠালেন, সেখানে অন্য শিক্ষকরাও উপস্থিত ছিলেন। যথারীতি তিনি উপস্থিত হলেন। বিভাগীয় প্রধান তাকে যা বললেন তা তিনি শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। বাংলা বিভাগীয় প্রধান তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি তোমার কথা রেখেছ, তুমি পাশ করেছ, শুধু পাশ করোনি তুমি দ্বিতীয় বিভাগে প্রথম হয়েছ (তখন প্রথম বিভাগ কেউ পেত না)। এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাকে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে রেখে দেব কিন্তু একটা শর্ত আছে, তা হলো তোমার রাজনীতি ছাড়তে হবে।’
কিন্তু এটাও কী করে সম্ভব? এটা হলে তো তার রাজনীতি করা শেষ হয়ে যাবে। না, এটা সম্ভব নয়। তিনি যে আদর্শকে বুকে ধারণ করে আছেন তা তিনি এক নিমেষেই শেষ করে দিতে পারেন না। তার বঙ্গবন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল...
ঘটনাটি ছিল ১৯৭০ সালের। নির্বাচনি প্রচারণার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান একবার ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলায় এসেছিলেন। নগরকান্দায় নির্বাচনি প্রচারণা শেষ করে ইঞ্জিনচালিত একটি নৌকায় চেপে নগরকান্দা থেকে ভাঙ্গার উদ্দেশে রওনা হলেন তখন বৃষ্টি হচ্ছিল, তেরো-চৌদ্দ বছরের একটি ছেলে ঐ নৌকায় থাকা মাইকের মাউথ ধরে নদীর দুই ধারের মানুষকে শেখ মুজিবুর রহমানের নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার জন্য আহ্বান করছিলেন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত বলছিলেন। নদীর দুই পাশে থাকা হাজার হাজার মানুষ বৃষ্টি উপেক্ষা করে নৌকা নৌকা বলে চিত্কার করছিলেন। আর শেখ মুজিবুর রহমান নৌকার ছইয়ের মধ্যে তাদেরকে হাত নেড়ে নেড়ে জবাব দিচ্ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান ছোট ছেলেটির বক্তব্য খেয়াল করছিলেন। ভাঙ্গায় নেমে শেখ মুজিবুর রহমান ঐ ছেলেটিকে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য ডেকে আনলেন।
শেখ মুজিবুর রহমান সেদিন আরো বলেছিলেন তুমি বড় হলে আমার মতো হবে। তার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছিলেন আর বলেছিলেন তুমি কখনো তোমার নীতি-আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইয়ো না। আরো বলেছিলেন ঢাকায় এসে তার সঙ্গে যেন দেখা করে।
কথা রেখেছিলেন হায়দার আলী মোল্লা। মৃত্যুর শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নীতি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি।
ঢাকায় এবং তার নিজস্ব পরিমণ্ডলে হায়দার আলী মোল্লা সত্, আদর্শ এবং নিষ্ঠাবান একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উদাহরণ হয়ে আছেন। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত স্বাভাবিক জীবন যাপন করতেন। কোনো লোভ-লালসা তাকে কখনো বিচ্যুত করতে পারেনি। তাই তো এখনো মানুষ তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। আজ ৬ মে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার আলীর দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকী।
n লেখক :ব্যাংকার
