নদীপথে যাত্রা বরাবরই মানুষের পছন্দের তালিকায় প্রথম সারিতে থাকে। নদীর বুক চিরে তীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মৃদু বাতাস—সব মিলিয়ে নদীপথের যাত্রায় এক স্বর্গীয় সুখ অনুভূত হয়। এখানে নেই সড়কপথের মতো অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নেই রেলপথের মতো একটানা শব্দের ঝামেলা কিংবা অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ। তাই অধিকাংশ মানুষেরই নৌপথ যাত্রায় থাকে প্রবল আগ্রহ।
তবে বর্তমানে নদীপথে যাত্রা হয়ে উঠেছে আতঙ্কের নাম। সম্প্রতি কয়েকটি ভয়ংকর ঘটনার সাক্ষী হয়েছে নদীগুলো। প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি বেপরোয়াভাবে নৌযান চালনা, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, নিয়মের তোয়াক্কা না করা, অদক্ষ চালক ইত্যাদি মানব-সৃষ্ট কারণে ঘটেছে এসব দুর্ঘটনা। একটু অসতর্কতার জন্য অকালে ঝরে যায় শত শত প্রাণ। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাইয়ের কারণে নদীপথের কান্না আরো দীর্ঘায়িত হচ্ছে। একটু বাড়তি লাভের আশায় নৌযান মালিকরা ধারণক্ষমতার অধিক যাত্রী উঠাতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নদীগুলোতে থাকে বাড়তি চাপ; যেমন ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, পহেলা বৈশাখ অথবা অন্যকোনো ছুটির দিন। এসব দিনে নৌযানগুলোতে যেন তিলধারণের স্থান থাকে না। বাড়তি লোকের কারণে অনেকের আনন্দে কাটানো দিনগুলো পরিণত হয় শোকাবহ দিনে।
গত ৩১ বছরে দেশে নৌ-দুর্ঘটনা হয়েছে ৬০২টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ জন এবং নিখোঁজ প্রায় ৬০০ জন। ২০০০ সালের ২৯ ডিসেম্বর চাঁদপুরের মতলব উপজেলার মেঘনা নদীতে চালকের অসাবধানতায় ঘটে মুখোমুখি সংঘর্ষ। এ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে ১৬২ জন; কিন্তু তারপরও সাবধানতার কোনো নিদর্শন চোখে পড়েনি। ২০০২ সালের ৩ মে চাঁদপুর জেলাতে আবারও দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৩৬৩ যাত্রী। দুর্ঘটনাটিতে লঞ্চের অধিকাংশ যাত্রীর মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা প্রাকৃতিক কারণে নয়, বরং চালকের বেপরোয়া গতির কারণে ঘটে। বছর না গড়াতে আরো ভয়াবহ দুর্ঘটনা এসে হাজির হয়। ২০০৪ সালের ৪ জুলাই চাঁদপুর এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাইয়ের কারণে লঞ্চডুবি হয়, এ দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে প্রায় ৬৫০ জন।
সাম্প্রতিক সময়ে নদীকেন্দ্রিক দুর্ঘটনাগুলো কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, গতমাসে শীতলক্ষ্যা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনা এবং গত কয়েক দিন পূর্বে পদ্মা নদীতে স্পিডবোট দুর্ঘটনা। বর্তমান মহামারির সময়ে প্রায় প্রতি মাসেই কোনো না কোনো মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে নৌপথগুলো। যার অন্যতম কারণ লকডাউনে তাড়াহুড়ো করে গন্তব্যে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। নদীপথের সব দুর্ঘটনা কাটিয়ে উঠতে এবং মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত না করে সুস্থ ও নিরাপদ নৌযাত্রা সবার প্রত্যাশা। সব ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রথমে দরকার জনসচেতনতা। ব্যক্তিপর্যায়ের সচেতনতা থাকলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া সম্ভব। যারা নদী পথে যাত্রা করে অধিকাংশের প্রবণতা থাকে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো। তাই তাড়াহুড়ো করে অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে নৌযানগুলোতে চলাচলের দৃশ্য দেখা যায় অহরহ। যার ফলে ঘটে মারাত্মক সব বিপর্যয়। কারণ সড়কপথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে যানবাহন থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ থাকলেও নৌপথে সেই সুযোগটা থাকে না, তাই সলিলসমাধি ঘটে অনেকেরই। নৌ-দুর্ঘটনা রোধে সরকারি মহলের কঠোর তদারকি দরকার। লাইসেন্সবিহীন নৌযানগুলো যেন চলতে না পারে এবং দক্ষ চালক দ্বারা যেন যানবাহনগুলো চালানো হয়—এমন কিছু কার্যকরী পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্ঘটনাগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাছাড়া চালকদেরকে বিভিন্ন সংকেত সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান করা জরুরি। এভাবে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বন্ধ হোক নদীকেন্দ্রিক দুর্ঘটনাগুলো, নদীপথে যাত্রা হয়ে উঠুক আনন্দময়।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
