বিদায় মাহে রমজান

আপডেট : ০৫ মে ২০২১, ২২:৩৬

আজ ১৪৪২ হিজরির ২৩ রমজানুল মোবারক। ‘কদর’ আরবি শব্দ। এর অর্থ মর্যাদা ও মাহাত্ম্য। এখানে বলা প্রয়োজন, কেন এই রাতকে ‘শবে কদর’ বা কদরের রাত বলা হয়। আদতে একজন বান্দা জীবনসাহারায় বিশাল পথ অতিক্রম করেছে। আল্লাহর দেওয়া অগণিত নিয়ামত ভোগ করেছে। পাপের কলঙ্কে মুছে গিয়েছে তার প্রকৃত অস্তিত্ব। তার জীবনসংসারের কোথাও মানবতার কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট নেই। মানুষ হিসেবে শির উঁচিয়ে দাঁড়াতে পারছে না। সে আজ বড় অসহায়। হতমান লাঞ্ছিত এই অভাগার জীবনেও যদি একটি ‘লাইলাতুল কদর’ এসে দাঁড়ায়, যদি একটি শবে কদরের আহ্বানও ধ্বনিত হয় তার জিন্দেগিতে, ঐ বান্দা যদি অতীতের কৃত সব পাপে অনুশোচনায় বিগলিত মন নিয়ে ইবাদত করতে পারে। সব অপরাধ বর্জনের বলিষ্ঠ শপথে প্রত্যয়ী হতে পারে। আগামী জীবনে আর ঘুণাক্ষরেও পাপ না করার সংকল্পে বদ্ধপরিকর ও অনুতপ্ত হয়ে মন থেকে তওবা করতে পারে, যদি নিখাদ ইবাদত সাধনায় এমন একটি মহিমান্বিত রজনি কাটাতে পারে তাহলেই তার এই আঁধারজীবন এক মহিমান্বিত জীবনে বদলে যাবে। আর এভাবেই শবে কদর সম্মান ও মর্যাদার রাত।

একটি অসহায় ও অবহেলিত জীবনে এনে দেয় চিরন্তন মর্যাদার প্রবাহ। সেখানে থাকে না তখন আর অপরাধের বিন্দু চিহ্ন। তখন আর বুঝতে কষ্ট হয় না। সত্যিই শবে কদর মহিমান্বিত জীবনের আশ্বাস সংবলিত জীবনের পয়গাম।

শবে কদর ঐ মহিমান্বিত রাত, যে রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদত অপেক্ষা উত্তম। এই রাতকে মাসব্যাপী তালাশ করতে হুকুম করা হয়েছে। আর শেষ দশ বিজোড় রাতে তালাশের বিশেষ হুকুম করা হয়েছে। যদি এই রাতসমূহ জাগরণ সম্ভব না হয়, তাহলে ২৭-এর রাতে তুলনামূলক অধিক ইবাদত করবেন। শবে কদরের ছওয়াব হাসিলের জন্য নূর ইত্যাদি দেখা আবশ্যক নয়। সবারই রমজানের প্রতি রাতে অধিক পরিমাণ ইবাদত করা উচিত এবং প্রতিটি রাতকে শবে কদর মনে করা উচিত। আল্লাহপাক রব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনুল করিমে ঘোষণা করেন, সে রাতে ফেরেস্তারা ও রুহ্ (হজরত জিবরাইল আ.) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করেন। শান্তিময় সেই রাত ফজরের সূচনা পর্যন্ত। (সুরা কদর, আয়াত :৪-৫) ইবনে হুবাইশ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনে কাবকে বলতে শুনেছি। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি সারা বছর রাত জাগ্রত থাকবে, সে লাইলাতুল কদর লাভ করবে।’ উবাই বলেন, ‘আল্লাহর শপথ করে বলছি, যিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, সন্দেহ নেই লাইলাতুল কদর রমজানে।’ তিনি নির্দিষ্টভাবে কসম করে বলেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমি জানি তা কোন রাত। এটা সেই রাত, যার কিয়ামের নির্দেশ আমাদের রসুলুল্লাহ (স.) প্রদান করেছেন, তা হচ্ছে সাতাশের সকালের রাত। তার আলামত হচ্ছে, সেদিন সকালে সূর্য উদিত হবে সাদা, তার কোনো কিরণ থাকবে না।’ (মুসলিম শরিফ)

ইবনে হিব্বানের এক বর্ণনায় আছে, ‘তার আলামত হচ্ছে, সেদিন সকালে সূর্য উদিত হবে সাদা, তার কোনো কিরণ থাকবে না, যেন তার আলো মুছে দেওয়া হয়েছে। (মুসলিম-৭৬২, ইবন হিব্বান-৩৬৯০) হজরত ইবনে আব্বাছ (রা.) বলেন, ‘আমি সূর্যের দিকে তাকিয়ে সেরূপ দেখেছি, যেরূপ নবি করিম (স.) বলেছেন। (আহমাদ :১/৪০৬, ইবনে আবি শায়বাহ্ ২/২৫০)

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (স.) বলেছেন, ‘লাইলাতুল কদর হচ্ছে সাতাশ অথবা ঊনত্রিশের রাত। সে রাতে কঙ্করের চেয়ে অধিক সংখ্যায় ফেরেস্তারা পৃথিবীতে অবস্থান করেবেন।’ (আহমাদ :২/৫১৯) উবাদা ইবনে সামেত (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (স.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই লাইলাতুল কদরের আলামত, তা হবে সাদা ও উজ্জ্বল,  যেন তাতে আলোকিত চাঁদ রয়েছে, সে রাত হবে স্থির, তাতে ঠান্ডা বা গরম থাকবে না, তাতে সকাল পর্যন্ত কোনো তারকা দ্বারা ঢিল ছোড়া হবে না। তিনি ইঙ্গিত দেন, ‘সেদিন সকালে সূর্য উদিত হবে সমানভাবে, চৌদ্দ তারিখের চাঁদের ন্যায়, তার কোনো কিরণ থাকবে না, সেদিন শয়তানের পক্ষে এ রাতে বের হওয়া সম্ভব নয়।’ (আহমাদ :৫/৩২৪)

জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (স.) বলেন, ‘আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হয়েছিল, অতঃপর তা ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর তা হচ্ছে শেষ দশকে। সে রাত হবে সাদা উজ্জ্বল, না গরম, না ঠান্ডা, যেন আলোকিত চাঁদ নক্ষত্রগুলোকে আড়াল করে আছে, ফজর উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সেই রাতে শয়তান বের হতে পারে না।’ (ইবন খুজাইমাহ-২১৯০, ইবন হিব্বা-৩৬৮৮)। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি করিম (স.) বলেন, লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তর দেন। ‘লাইলাতুল কদর সাদা-উজ্জ্বল, না গরম না ঠাণ্ডা, সেই দিন ভোরে সূর্য উদিত হবে দুর্বল রক্তিম আভা নিয়ে।’ (ইবন খুযাইমাহ-২১৯২)।

আমাদের প্রত্যেক মুসলিমের উচিত, আজকের মহান পুণ্যময় লাইলাতুল কদরকে যথাযথভাবে তালাশ করা। আল্লাহপাক আমাদের পবিত্র লাইলাতুল কদরে পূর্ণাঙ্গ ইবাদত করার তাওফিক দান করুন। আমিন! ছুম্মা আমিন!

লেখক :অতিথি অনুবাদক, মক্কা আল মুকাররামাহ ও সাবেক খতিব, জাতীয় সংসদ জামে মসজিদ