করোনা হইতে মুক্তির তুলনামূলক একটি পথ পাওয়া গিয়াছে বটে; কিন্তু সেই পথ এই মুহূর্তে অত্যন্ত সংকীর্ণ, তাহাতে ট্রাফিক জ্যামও ব্যাপক। সেই পথটি হইল করোনার টিকাকরণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফাইজার, মডার্না, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, জনসনসহ অনেকগুলি টিকার অনুমোদন দিয়াছে। ইহার বাহিরেও চীনের সিনোফার্ম এবং রাশিয়ার স্পুিনক-ভি ও ভারতের নিজস্ব টিকা কোভ্যাকসিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ অনুমোদন করিয়াছে। অর্থাত্ অনেকগুলি ‘বিকল্প’ এই বিশ্বের সামনে রহিয়াছে; কিন্তু ‘টিকা জাতীয়তাবাদ’ গণটিকাকরণের ক্ষেত্রে ভয়াবহ পথের কাঁটা তৈরি করিয়াছে।
আমরা দেখিতে পাইতেছি, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে টিকাদান কর্মসূচি অনেকটাই আগাইয়া লইয়াছে। মহাদেশভেদে করোনার টিকা প্রদানের হার উত্তর আমেরিকায় শতকরা ৪৮, ইউরোপে ৩২, দক্ষিণ আমেরিকায় ১৮, এশিয়ায় ১২ এবং আফ্রিকায় মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাত্, উন্নত দেশগুলির কোটি কোটি মানুষ টিকা পাইয়াছে বিধায় সেইখানে সংক্রমণ পূর্বের চাইতে অনেক কমিয়া আসিয়াছে। মানুষও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিতে শুরু করিতেছে। ধীরে ধীরে গতি ফিরিয়া পাইতেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। ইহার বিপরীতে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়িতেছে। প্রয়োজনীয় টিকা পাইতেছে না এই সকল দেশ। ফলে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে সবচাইতে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীও টিকা হইতে বঞ্চিত হইতেছে। যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলিয়াছে, টিকা পাইবার নিশ্চয়তা বৈশ্বিক মানবাধিকার; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দুঃখজনকভাবে আমরা দেখিতে পাইতেছি, একদিকে ধনী দেশগুলিতে টিকার বাড়তি মজুত রহিয়াছে, অন্যদিকে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশেগুলিতে টিকার হাহাকার। ইহার মধ্যেই করোনার অতিসংক্রামক ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট কাঁপুনি ধরাইয়াছে সমগ্র বিশ্বের। প্রতিবেশী দেশ হিসাবে আমাদের উদ্বেগটাও যথেষ্ট। কারণ, গণটিকাকরণ ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে আমরা শুরু করিতে পারিলে তাহা এই মুহূর্তে থমকাইয়া গিয়াছে টিকার অভাবে।
ভারতে কোভিডের ভয়াবহ অবস্থা বাকি বিশ্বের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করিয়াছে। কারণ, বিশ্বের ৬০ শতাংশ ভ্যাকসিন কেবল ভারতেই তৈরি হয়। সেই কারণে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ৯২টি দেশ অপেক্ষায় ছিল যে, তাহাদের ভ্যাকসিনের চালান আসিবে ভারত হইতে; কিন্তু বিশ্বের অন্যতম বড় টিকা উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার প্রধান আদর পুনেওয়ালা সম্প্রতি জানাইয়াছেন যে, ভারতের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হইলে আপাতত অন্য কোনো দেশ টিকা পাইবে না; কিন্তু বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলিতে সস্তায় বা বিনা মূল্যে কোভিড ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ‘কোভ্যাক্স’ নামে আন্তর্জাতিক যে উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে, ভারত হইতে সেইখানে ২০ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহের কথা। তাহাও আপাতত হিমঘরে চলিয়া গিয়াছে। অথচ টিকা ব্যতীত এই মহামারি হইতে রক্ষা পাইবার আপতত আর কোনো শর্টকাট পথ নাই।
আমরা দেখিতে পাইতেছি, টিকা জাতীয়তাবাদ ও করপোরেট লভ্যাংশ ভাগ করিয়া না লইবার প্রবণতার পাশাপাশি করোনার টিকার ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব বড় সমস্যা হিসাবে দেখা দিয়াছে। তবে সুখবর হইল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন করোনা টিকার উপর মেধাস্বত্ব প্রত্যাহারের দাবিতে সমর্থন জানাইয়াছেন। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, মেধাস্বত্ব পাইলে যেই সকল দেশের সক্ষমতা রহিয়াছে, তাহারা নিজেরাই করোনার টিকা উত্পাদন করিতে পারিত। ইহাতে একদিকে যেমন টিকার উত্পাদন বৃদ্ধি পাইত, অন্যদিকে করোনা মহামারির লাগাম দ্রুত টানা সহজ হইত। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করিতেছেন, ভারতে বর্তমানে বিশাল আকারে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবের ফলে মিউটেশনের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসের এমন সংস্করণ সৃষ্টি হইতে পারে, যেইগুলিতে বিদ্যমান টিকাগুলি অকেজো হইয়া যাইতে পারে। এই বিপদ সকলের, সুতরাং ইহাকে সামলাইতেও হইবে জরুরি ও কার্যকর এবং অভূতপূর্ব পদক্ষেপের মাধ্যমে। টিকার মেধাস্বত্ব তুলিয়া লওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে টিকা উত্পাদনই এখন সবচাইতে সহজ সমাধান।
