বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এসে মনে পড়ছে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। সেই রক্তাক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে একবারের জন্যও কি ভেবেছিলাম যে স্বাধীনতা দেখব এবং স্বাধীনতার ৫০ বছর, অর্থাত্ সুবর্ণজয়ন্তী দেখার সৌভাগ্যও আমার হবে! পরমেশ্বরকে কৃতজ্ঞতা জানাই অতি সামান্যজন হয়েও আমি সুদিন-দুর্দিন প্রত্যক্ষ করে পেরিয়ে এসেছি স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৫০ বছর। গত ৫০ বছরের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ কষেছেন দেশের পণ্ডিতজনেরা। আমি অবশ্য কী পেয়েছি অথবা কী পাইনি তার হিসাবে যাব না। আমি কেবল তিনটি প্রত্যাবর্তন দিবসের কথা সবিনয়ে উল্লেখ করব যে দিবসগুলো দেশ ও জাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে গেছে। বলতে দ্বিধা নেই ঐতিহাসিক তিনটি প্রত্যাবর্তন দিবস বাঙালি জাতির অস্তিত্বকে রক্ষা করেছে। নইলে ইতিহাস অন্য পথে যেত। প্রথমটি বিজয়ের মাত্র ২৫ দিনের মাথায়, যেদিন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বর্বর পাকিস্তানিদের বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। অর্থাত্ ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সাল। শীতের কুয়াশা ভেদ করে বঙ্গবন্ধু ফিরলেন শোকে মুহ্যমান জাতির মধ্যে প্রেরণার অফুরান উত্স হয়ে। প্রত্যাবর্তনের অন্য দিন দুটি ১৯৮১ সালের ১৭ মে এবং ২০০৭ সালের ৭ মে। বাহাত্তরের শীতে ফিরলেন পিতা। আর উল্লিখিত মে মাসের দুটি দিনে ভিন্ন ভিন্ন বছরে ফিরলেন তারাই কন্যা শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ফিরলেন সর্বাঙ্গে শীত ভাঙা রোদ মেখে। প্রিয় বাঙালিপুত্র-অদর্শনে জীবন্মৃত বৃদ্ধ বাবা-মা, প্রিয়তমা স্ত্রী এবং আদরের পুত্র-কন্যা ও নিকট আত্মীয়দের সান্নিধ্যে তারই নেতৃত্বে পাওয়া স্বাধীন স্বদেশে আর অভাগা কন্যা ফিরলেন গ্রীষ্মের দাবদাহ আর ঝড় উপেক্ষা করে চেনা-অচেনা শত্রুর পাতা ফাঁদকে তোয়াক্কা না করে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার সাহস নিয়ে, অনেকটা নিজ দেশে পরদেশি হয়ে। সম্বল ছিল চিরায়ত বাঙালির ভালোবাসা পিতার হাতে গড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সমর্থন এবং সহমর্মিতা (সব নেতাই যে তার দেশে ফিরে আসাটা পছন্দ করেছিলেন, তা বোধ হয় নয়)। নির্মম পঁচাত্তরের মধ্য আগস্টে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিহত হলেন জাতির পিতা এবং তার পরিবারের সবাই। এটি কেবল একজন নেতাকে হত্যা নয়, হত্যা করা হলো বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রিয় স্বাধীনতাকে। নৃশংসতার হাত থেকে জীবনে রক্ষা পেলেন বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতার দুই প্রিয় সন্তান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, বিদেশে অবস্থানের কারণে। সঙ্গে অবোধ শিশু জয় ও পুতুল। কী নিদারুণ কষ্টে বুকে পাথর বেঁধে এক দেশ থেকে আরেক দেশে প্রায় শরণার্থী জীবনে কেটে গেল প্রায় ছয়টি বছর।
দুই অনাথ সহোদরার সেসব দিনের জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে পড়েছি, শুনেছি এবং জেনেছি, ‘শেখ হাসিনা এ ডটার্স টেল’ প্রামাণ্যচিত্রটি দেখে। এই প্রামাণ্যচিত্রটি দেখার সময় অন্ধকার থিয়েটার হলে অনেক দর্শকের ডুকরে কেঁদে ওঠার অস্ফুট শব্দ শুনে আঙুলের ডগায় মুছেছি নিজের চোখের জলও। অকুল সাগরে খড়কুটোর মতো এক টুকরো আশাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থেকেছেন বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার দুই প্রাণের ধন। আশা না বলে বলা উচিত, কঠিন প্রতিজ্ঞা বুকে লুকিয়ে অনাথ বড় কন্যা নেমেছিলেন তেজগাঁও বিমানবন্দরে। প্রতিজ্ঞা ছিল পিতৃহত্যার বিচার, শত্রুর হাত থেকে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতিকে বিশ্বমাঝে উচ্চতর স্থানে তুলে আনা। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাহস জুগিয়েছেন রক্ত সহোদরা শেখ রেহানা। ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বরের সর্বত্র তখনো কালরাতের স্মৃতিচিহ্ন। দেওয়ালে দেওয়ালে আপনজনের রক্তের বিষাদ আলপনা। কালচে এবং ধূসর যেন সারাক্ষণ হাতছানি দিয়ে ডাকে প্রিয় স্বদেশ, ডাকে প্রিয় বাঙালি। সেই সময় একাশির ১৭ই মের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মিলিটারি শাসকদের রক্তচক্ষু, হত্যা, ষড়যন্ত্র ইত্যাদিকে বৃদ্ধাঙুল দেখিয়ে প্রায় ছয় বছর পর প্রিয় স্বদেশের মাটিতে পা রাখলেন দুঃসাহসী শেখ হাসিনা। বাহাত্তরে পিতা বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তন করেছিলেন তার প্রিয় দেশবাসী আর আপন পরিবারের কাছে। প্রায় ১০ বছর পরে কন্যা শেখ হাসিনা প্রত্যাবর্তন করলেন স্বজনহারা গোরস্থানের মতো বুক হুহু করা বত্রিশ নম্বরে। নিষ্ঠুর শাসকদের চরম অসভ্যতায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে নিজ বাড়ির অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পেরে বসে পড়লেন বাংলার ধুলোমাখা বত্রিশ নম্বরের রাস্তায়। প্রায় অচেতন তিনি গভীর ভালাবোসায় অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন ধর্মের পবিত্র শব্দাবলি। দুই চোখে তখন অশ্রুর সাগর। লেকের অপর পাড়ে জড়ো হওয়া ভক্তকুলের মুখে তখন বাঙালির প্রিয় স্লোগান ‘জয় বাংলা’। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর বাংলার গাছের পাতা কেঁপে উঠল মুক্তিযুদ্ধের শক্তি জাগানিয়া এই স্লোগানে। পাখিকুল ফড়ফড় উড়ে গেল এদিক-সেদিক। পরে এই দিনটিকে উপলক্ষ্য করে লিখেছিলাম, তুমি ফিরে না এলে বাঙালি আর বাঙালি থাকত না, বাংলাদেশে হয়ে যেত ভিন্ন এক দেশে। যে দেশে মানবতা নাই, মুক্তি নাই, প্রেম ভালোবাসা নাই, সম্প্রীতি নাই, যে দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নাই, বঙ্গবন্ধুর নাম নেওয়া যে দেশে আপরাধ। ২০০৭ সালের প্রেক্ষাপটে এবারে কিছুটা স্মরণ করি। এক-এগারোর গণেশ উলটে দেওয়া কুশলীবদের প্রতিনিধিরা সরকার পরিচালনার শপথ নেন এক-বারোতে। বিএনপি জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন কিছুটা হলেও তখন থেমে যাওয়ার পর মার্চের পনেরোতে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা আমেরিকা ও কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। এটি ছিল একেবারেই ব্যক্তিগত ভ্রমণ—পুত্র-পুত্রবধূ, কন্যা-জামাতা এবং নাতি নাতনির সঙ্গে সময় কাটাবার জন্য। এর পরই শুরু হয় ‘সংস্কারপন্থি’দর ষড়যন্ত্রের খেলা। দেশের একটি জনপ্রিয় বাংলা দৈনিকের সম্পাদক তখন উপস্থিত হলেন মাইনাস টু ফর্মুলা নিয়ে। অর্থাত্ শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনকেই হটাও। সংস্কারপন্থিদের আগুনে এটা যেন ঘি ঢালার কাজ করল। শুরু হলো সরকারের নেপথ্য কুশীলবদের সঙ্গে সংস্কারপন্থিদের চোর-পুলিশ খেলার ছলে গোপনে মন দেওয়া-নেওয়া। লক্ষ্য একটাই, দেশের ভবিষ্যত্ রাজনীতির লাটাই সংস্কারপন্থিদের নিজের হাতে রাখা।
এরই মধ্যে এপ্রিল মাসের ছয় তারিখে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করল দেড় বছর পরে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনার কথা। শেখ হাসিনা তখন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়। সেখান থেকেই তিনি কড়া প্রতিবাদ করলেন নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের এবং দাবি করলেন দ্রুত নির্বাচন দিয়ে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের। এই সময় এপ্রিলের ৯ তারিখে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দায়ের করেন জনৈক তাজুল ইসলাম। শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আসার তারিখ ছিল ২৩শে এপ্রিল। কিন্তু তখনকার সরকার এবং সরকারের চালিকাশক্তি এপ্রিল মাসের ১৮ তারিখে প্রেস নোট জারি করে শেখ হাসিনাকে দেশের জন্য বিপজ্জনক ঘোষণা করে এবং এয়ারলাইনসগুলোকে নিষেধ করে তাকে যাত্রী হিসেবে বাংলাদেশে না আনতে। একই সঙ্গে তারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সৌদি আরব যেতে সম্মত করায় এবং যাত্রার দিন নির্ধারিত হয় ২২শে এপ্রিল। খালেদা জিয়ার প্রস্তাব ছিল যে তিনি তার দুই পুত্র, পুত্রবধূ এবং নাতি-নাতনিসহ দেশ ছাড়তে চান। কিন্তু এক-এগারোর ক্ষমতাশালী চক্র বন্দি তারেক জিয়াকে মুক্তি দিতে রাজি হয় না। এদিকে আমেরিকা থেকে লন্ডনে বোনের বাসায় এসে শেখ হাসিনা ২৩শে এপ্রিল দেশে ফেরার জন্য মনস্থির করেন এবং সেইমতো বিমানের টিকিটও কাটেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত সাক্ষাত্কারে তিনি বারবার দৃঢ়ভাবে দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের কথা বলতে থাকায় ক্ষমতাশীলের দল তাদের সিদ্ধান্ত বদলানোর চিন্তাভাবনা শুরু করে। খালেদা জিয়াও সব প্রস্তুতির পর শেষ মুহূর্তে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কারণেই বোধ হয় খালেদা জিয়া দেশত্যাগের ব্যাপারে মত বদলান। খালেদা জিয়া যদি সেদিন সপরিবারে সৌদি আরবে চলে যেতেন, তাহলে বিএনপির রাজনীতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াত, সে ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা কী বলেন জানি না। তবে আমার সামান্য রাজনৈতিক জ্ঞানে মনে হয়, শেখ হাসিনার অনমনীয় দৃঢ়তা খালেদা জিয়া এবং বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে সচল রেখেছে। আবারও বলছি, এটা একান্তই আমার নিজস্ব ধারণা।
ক্ষমতাশীলদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, সংস্কারপন্থিদের কূটচালের কাছে নতি স্বীকার না করে ২০০৭ সালের মে মাসের ৭ তারিখে লাখো ভক্তের ভিড়ে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা নিজ ভূমিতে। রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতা এবং পিতৃদত্ত সাহস তাকেই শুধু অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়নি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাকেও রেখেছে সচল ও বেগবান। শেখ হাসিনা যদি সেইবার দেশে না ফিরে আসতেন অথবা স্বৈরশাসকের দল যদি তাকে দেশে ফিরতে না দিত, তাহলে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ তিমিরে পতিত হতো সেই তিমির হননে শেখ হাসিনাকেই পরবর্তী সময়ে নেতৃত্বের হাল ধরতে হতো। সেদিন শেখ হাসিনা ফিরে আসতে পেরেছিলেন বলেই বাংলাদেশের আজ অনেক অর্জন এবং অফুরান সম্ভাবনা। নিয়ত বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশের মতোই। নিজ ক্ষমতায়। নিজস্ব ধারায়। তিমির হননের নেত্রীর পরাভব না মানা নেতৃত্বে।
লেখক: আহ্বায়ক, সম্প্রীতি বাংলাদেশ
