প্রতি বছর বাংলাদেশে যত মানুষ মারা যায়, তার ৬৭ শতাংশ মৃত্যুই ঘটে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে। অসংক্রামক রোগ (Non Communicable Disease) বলতে মূলত হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ ইত্যাদিকে বোঝায়। বাংলাদেশে এসব রোগসংক্রান্ত চিকিত্সাব্যবস্থার উন্নতি হলেও তা এখনো যথেষ্ট নয় এবং ব্যয়বহুলও বটে। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ঘোষণা দিয়েছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোতে শুধু ক্যানসারেরই অনুমিত বৃদ্ধি ৮১ শতাংশ। এর ভিত্তিতে আঁচ করা যায়, অসংক্রামক রোগের ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে চিকিত্সাব্যয়ও বাড়বে। কিন্তু এসব রোগ কীভাবে প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেসব নিয়ে দেশে কোনো কার্যকর প্রয়াস চোখে পড়ে না। এমনকি সচেতনতা বা তেমন চিন্তা-ভাবনার আভাসও লক্ষ করা যায় না।
অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে শহরীকরণ ও যান্ত্রিকায়ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। দেশে আজকাল বৈঠা টানা মাঝি বা লাঙল বাওয়া চাষির তেমন দেখা মেলে না, কয়েকটি বড় শহর ছাড়া দেহ খাটিয়ে খাওয়া রিকশা-ভ্যানের চালকও পাওয়া যায় না। পরিবেশদূষণসহ নানা কারণে মানুষের হাঁটাহাঁটির অভ্যাসও কমে গেছে। দৈহিক পরিশ্রমহীনতা, পরিবর্তনশীল খাদ্যাভ্যাস ও জীবনপদ্ধতি মানুষকে স্থুলতা, ডায়াবেটিস, হূদেরাগ বা স্ট্রোক, ক্যানসার ও হাড়ক্ষয়ের মতো নানাবিধ অসংক্রামক রোগের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যান্য মারাত্মক রোগের সঙ্গে মুখ ও দাঁতের রোগ বৃদ্ধিও সবিশেষ লক্ষণীয়।
মুখ ও দাঁতের রোগের সঙ্গে সঙ্গে একই ধরনের ঝুঁকির কারণে বেড়ে চলেছে চার ধরনের মারাত্মক অসংক্রামক রোগ—হূদেরাগ বা স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্টজনিত রোগ। সাধারণভাবে ঝুঁকি তিন ধরনের—খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন (যেমন বার্গার, চিপস, আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয় বা অতিরিক্ত পরিশোধিত শর্করাজাতীয় ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো অতিরিক্ত নরম খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ততা), পানাহারজনিত বদভ্যাস (যেমন সিগারেট বা বিড়ির মতো ধূমপান এবং পান বা পানব্যতিত নানা ধরনের তামাক চিবানো), যে কোনো ধরনের মানসিক চাপ। এই ঝুঁকিগুলোর কারণে মুখ ও দাঁতের রোগ দেখা দিতে পারে আবার ঐ দাঁতের রোগের কারণে ওপরে উল্লেখিত অসংক্রামক রোগগুলোর সম্ভাবনা আরো বেড়ে যায়। দাঁতের রোগের কারণে কম ওজনের সন্তান প্রসব বা পরিণত হওয়ার আগেই প্রসবের আশঙ্কা বেড়ে যায়। ফলে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা, পানাহারজনিত বদভ্যাস কমানো এবং মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি দাঁত ও মুখ নিয়মিত পরিষ্কার রাখলে যে কোনো মারাত্মক অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কাও কমে। বেশ কিছুদিন ধরেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দাঁতের ডাক্তার ও তাদের সহকর্মীরা সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যকর জীবনপদ্ধতি সংগঠিত করতে পারে এবং সবাইকে সঠিক খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে ও তামাক বর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম। তাই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অসংক্রামক রোগ ও মুখের রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কার্যক্রমকে সমর্থন দিচ্ছে।
বিগত নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন সময়ে, বিক্ষিপ্তভাবে হলেও কিছুদিন, বাংলাদেশের স্কুলশিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা ও পদ্ধতি সম্বন্ধে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বেশ কিছুদিন হলো এই উদ্যোগ বন্ধ। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কার্যক্রমেরই কিছুটা উন্নতি সাধন করে তিন বছরের একটি মডেল প্রজেক্ট (২০০৮-২০১১) চালু করে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি—জাইকা (JICA)। এর অধীনে নির্দিষ্ট একটি ইউনিয়নের প্রাথমিক স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের অভিভাবক, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যার পদ্ধতি সম্পর্কে বছরে দুবার প্রশিক্ষণ এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যার ভূমিকা নিয়ে বছরে একবার পরিচিতিমূলক সভা করা হয়। পাশাপাশি নিয়মিতভাবে স্কুলশিশুদের মুখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলে। জাইকার তিন বছরের কার্যক্রম ২০১১ সালে শেষ হলেও তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের উদ্যোগে সীমিত আকারে ঐ কার্যক্রম চালু ছিল দেশের বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন স্তরের প্রাথমিক স্কুলে। তবে তা শুধু ছাত্রছাত্রীদের মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যার পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করা, প্রশিক্ষণ দেওয়া ও মুখের স্বাস্থ্য পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ঐ কার্যক্রম থেকে বেশ কজন ‘মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিশেষজ্ঞ’ তৈরি হয়। ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে আবার জাইকার অর্থায়নে ঝর্না (JHORNA) নামে একটি জাপানি এনজিও বাংলাদেশের বয়স্বী কল্যাণ সমিতি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান প্যারাগন গ্রুপের সহযোগিতায় আবারও ঐ কার্যক্রম শুরু করে। মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যা বিশেষজ্ঞরা নিয়মিতভাবে গাজীপুরের ১০টি স্কুল ও মৌলভীবাজারের রাজনগর ও বরলেখা উপজেলার তিনটি চা-বাগানের সব কর্মী, তাদের পরিবারের সব সদস্য এবং বাগানে অবস্থিত সব প্রাথমিক স্কুলশিশুর মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যার পদ্ধতি (দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করা), স্বাস্থ্যসম্মত যথাযথ খাবার নির্বাচন ও তামাক বর্জন প্রভৃতি শেখান। নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে শুধু মুখের অবস্থাই বোঝা যায় তা নয়; এর মাধ্যমে অনেক অসংক্রামক রোগ, যেমন নানা ধরনের ক্যানসার, ডায়াবেটিস, নানা রকমের অপুষ্টিজনিত রোগ, এইচআইভি/ এইডসসহ বিভিন্ন ভাইরাল ইনফেকশন ইত্যাদির প্রাথমিক রোগনির্ণয়ও সম্ভব। প্রথমেই রোগ নির্ণয় করতে পারলে রোগগুলো নিয়ন্ত্রণ সহজ হয় এবং ব্যয়ের বোঝাও বাড়ে না। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র এমন উদ্যোগ গোটা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জাতীয় কার্যক্রম।
আশপাশের দেশসহ বিভিন্ন দেশে জাতীয় মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যা কার্যক্রম (National Oral Health Care Program) সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে। অল ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্স (AIIMS) এই কাজে ইউটিউবকেও সফলভাবে ব্যবহার করছে। অথচ বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে এখনো এ ধরনের কোনো কার্যক্রম শুরু হয়নি। এমনকি জাতীয় পর্যায়ে মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তারও আলাদা করে কোনো স্বীকৃতি নেই। পরীক্ষা-নিরীক্ষা-চর্চায় আজ বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত, জাতীয় মুখের স্বাস্থ্য পরিচর্যা কার্যক্রমের মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে সহজে মুখের রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং একই সঙ্গে কিছু মারাত্মক অসংক্রামক রোগ (হূদেরাগ বা স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার) কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব।
n লেখক :অধ্যাপক ও জাইকার অর্থায়নে মাঠ পর্যায়ের প্রকল্প ‘Health Promotion for Regional People by Oral Health Care Specialist’-এর অবৈতনিক কো-প্রোজেক্ট ম্যানেজার
