আজ ৭ মে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আহসান উল্লাহ মাস্টারের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে থেকে গণমানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। শ্রমিক-জনতার আপনজন আহসান উল্লাহ মাস্টার আজ তার নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত। এক যুগ আগে ঘাতকের বুলেট জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিলেও আহসান উল্লাহ মাস্টার আজ আরো বেশি দীপ্তিমান।
আহসানউল্লাহ মাস্টার ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক ও নির্যাতিত হয়েছিলেন। ভারতের দেরাদুনের তান্দুয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে পুবাইল, টঙ্গী, ছয়দানাসহ বিভিন্ন জায়গায় গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ জয়দেবপুরের ক্যান্টনমেন্টের বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করতে ঢাকা থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনীকে ব্যারিকেড দিয়ে বাধা দেওয়ার জন্য জনতাকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং ডাক দেন বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করার। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটক হন এবং নির্যাতিত হন। আহত অবস্থায় আহসান উল্লাহ মাস্টার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ভারতের দেরাদুনের তান্দুয়া থেকে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে ডাঙ্গা, পুবাইল, টঙ্গী, ছয়দানাসহ বিভিন্ন স্থানে গেরিলাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
আহসান উল্লাহ মাস্টারের শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ গ্রামের হায়দরাবাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষাজীবন শেষ করে টঙ্গী হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। তখন থেকেই টঙ্গীতে ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে রাজপথে নামে ছাত্রছাত্রীরা। সে সময় টঙ্গীতে যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই আন্দোলনে স্কুলপড়ুয়া ছাত্র আহসান উল্লাহ রাজপথে নেতৃত্ব দেন। তখন থেকে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। আহসান উল্লাহ ১৯৬৫ সালে টঙ্গী হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করে ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে অবস্থিত তত্কালীন কায়েদে আজম কলেজে (বর্তমান শহিদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ) একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা দাবি নিয়ে ছাত্রছাত্রীরা যখন রাজপথে, তখনো ভাওয়ালের এই সন্তান আহসান উল্লাহ রাজপথের একজন সাহসী সৈনিক। রাজনীতির লড়াকু সৈনিক হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠতে থাকে। তিনি পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে রাজনীতি চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৬৮ সালে তথাকথিত আগরতলা মামলায় বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিযুক্ত করে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার চক্রান্ত করে। ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহ করার নিমিত্তে টঙ্গী-জয়দেবপুরের জন্য যে কমিটি গঠিত হয়েছিল, সেই কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন আহসান উল্লাহ মাস্টার। তিনি কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে ‘মুজিব তহবিল’-এর জন্য প্রতিটি কুপন ১০ পয়সা করে বিক্রি করেন। ১৯৬৯ সালে ৬ দফা ও ১১ দফার ভিত্তিতে গণ-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আহসান উল্লাহ ১৯৭০ সালে ডিগ্রি পাশ করেন। টঙ্গীর নতুন বাজারে অবস্থিত টঙ্গী হাইস্কুল আউচপাড়ায় স্থানান্তর হওয়ার পর টঙ্গীর নোয়াগাঁওয়ে এম এ মজিদ মিয়া হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৯ সালে। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য যে কজন শিক্ষানুরাগীর অবদান ছিল, তাদের মধ্যে আহসান উল্লাহ একজন। স্কুলটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি ঐ স্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক (১৯৭৭-১৯৮৪) এবং এর পরে প্রধান শিক্ষকের (১৯৮৪-২০০৪) দায়িত্ব যোগ্যতার সঙ্গে আমৃত্যু পালন করেন।
উল্লেখ্য, আহসান উল্লাহ মাস্টার গাজীপুর-২ (গাজীপুর সদর-টঙ্গী) আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুই বার সংসদ সদস্য, ১৯৯০ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৩ ও ১৯৮৭ সালে দুই দফা পুবাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুর-২ আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ ও জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যকরী সভাপতি পদে আসীন থাকাকালীন সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে নিহত হয়েছিলেন আহসানউল্লাহ মাস্টার। এ মামলায় ২০০৪ সালের ১০ জুলাই পুলিশ অভিযোগপত্র দায়ের করে। ঢাকার একটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ২২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয় আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। খালাস দেওয়া হয় দুই আসামিকে। ২০০৫ সালে নিম্ন আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স ও জেল আপিল হাইকোর্টে যায়।
উল্লেখ্য, আহসান উল্লাহ মাস্টারের সম্মানে তার নাম অনুসারে গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান (স্নাতক) ছাত্র হলের নামকরণ করা হয়েছে এবং ২০১৩ সালে টঙ্গীতে শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া টঙ্গীতে তার স্মৃৃৃৃতিতে শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়ালসেতু ও আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল রয়েছে।
জননেতা শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার আজীবন অসুস্থ রাজনীতি ও অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। আজ সেই অসুস্থ রাজনীতি ও অপশক্তির বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণ ঘটুক, শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টারের ১৭তম মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
n লেখক :সাংবাদিক
