সাম্প্রতিক

চেনা ফুলের ঐশ্বর্য

আপডেট : ০৬ মে ২০২১, ২১:৩৯

 

শহরে বড় হওয়া মানুষগুলো গ্রামে এলে কেমন যেন অচেনা হয়ে যায়, যেন অন্য দেশে এসে পড়েছে। ধানগাছে তক্তা হয় কি না ধাঁধায় পড়ে। গ্রামের পথে হাঁটতে গিয়ে যা কিছু দেখে তাতেই বিস্ময় আর কত রকমের প্রশ্ন। প্রশ্ন থাকা ভালো, আর বিস্মিত হবার গুণটি তো মানুষেরই থাকে।

গ্রামে-গঞ্জে নিপাট সবুজ ঝোপঝাড়ে বেশ চোখে লাগার মতো হলদে বরণ ফুলগুলো কেবল যে শহুরে মানুষেরই বিস্ময় জাগায় তাই-ই নয়—গ্রামের আটপৌরে মানুষগুলোও খানিক মুগ্ধ চোখে দেখে—কী তার শোভা, কী তার রঙের বাহার! সত্যিই থোকায় থোকায় অমন ফুলের দিকে তাকালে চোখ ফেরায় সাধ্য কার!

মেঠোপথের ধারে, রেললাইনের পড়ে থাকা জমিতে, কোথাও বা ধানিজমির আল ঘেঁষে আপনজালা গাছটি একটু অন্যরকম মনোযোগ কাড়ে। মাঝারি সমান গাছের ডালপালায় সুবিন্যস্ত সবুজ পাতার মাঝ থেকে খাড়া মাথা তুলে কাঁচা হলুদ বরণ ফুল ফুটলে তো কথাই নেই। গুল্মজাতীয় এই গাছটি দ্রুত বাড়ে।

আমি যত্ন করে টবে লাগিয়েছিলাম অর্নামেন্টাল গাছ হিসেবে। ফুল ফুটল সেপ্টেম্বরে; জানুয়ারি পর্যন্ত ছিল। পরে দেখি শোভা বর্ধনের জন্য সারি করে কুমুদিনীর বাগানে লাগানো হয়েছে। এখন তাতে চিকন লম্বাটে ফল ধরেছে। ফলের মধ্যে প্রচুর বীজ। এই বীজ থেকে গাছ। সে গাছে নাইবা হলো সুমিষ্ট ফল, নাইবা হলো কাঠের মূল্য—মূল্য যে তার ফুলের ঐশ্বর্যে! এরা ক্যশিয়া জাতের ফুল। এর আরেকটি বুনো জাতের নাম ‘কালকাসুন্দা।’ একদম বাড়তি যত্ন চায় না।

এরা আমাদের দেশে বাতাসে ভেসেই কি এলো সেই সুদূর মেক্সিকো কিংবা মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে? আশ্চর্য, নতুন জায়গা খুঁজে নিতে গাছেদের জুড়ি নেই। 

এরা দাদমর্দন ঔষধি গাছ হিসেবে সুপরিচিত। নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি দাদ-পাচড়া, চর্ম-রোগে এর পাতার রস একেবারে অব্যর্থ ওষুধ। মেছতার দাগ নির্মূলেও সুফল পাওয়া গেছে। কাজের সময় বিনে পয়সার ওষুধের কথা ক’জনেরই বা মনে থাকে? সোজা ডাক্তার বাড়ি দৌড়াই। আগে তো মানুষের হাতে এত পয়সা ছিল না। ডাক্তারও নয় হাতের কাছে। কবিরাজই ছিল ভরসা। চারপাশের নানা ঔষধিগাছ চিনত তারা। কখনো শিকড় বেটে, কখনো পাতার রস খাইয়ে কত কঠিন রোগ ভালো করে দিয়েছেন তাঁরা, তার লেখাঝোকা নেই।

এখন সেসব কোথায়? বন উজাড় হচ্ছে, হারাচ্ছে ঔষধিগুণে ভরা গাছগাছালি। গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন কবিরাজ মশাইরাও। না, তাঁরা আছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের পেশা হারাতে বাধ্য হচ্ছেন। এইসব হারানোর  সময়টাতেই আকুল হয়ে শুভকামনা জানাই—

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।