কয়েকটি ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বাবুল মিয়া। এরপর পছন্দসই একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে যেতেন নির্জন এলাকায়। যেতে যেতে পথে অটোচালকের সঙ্গে নানা রকম খোশগল্প শুরু করেন বাবুল মিয়া। তার আধাপাকা চুল, বেশভূষা আর অসহায় আচরণ সহজেই মন গলিয়ে ফেলত চালকের। গন্তব্যে যাওয়ার পর রাস্তা থেকে অল্প একটু দূরে তার বাড়ি দেখিয়ে বলতেন, আমার তো এতগুলো ব্যাগ নেওয়ার শক্তি নেই। বয়স তো কম হয়নি। যদি ব্যাগগুলো নিয়ে একটু সহযোগিতা করতে, বড্ড উপকার হতো। তার এই বিনয়ী কণ্ঠের আবেদনে না বলতে পারতেন না অটোচালক। সিএনজি অটো রেখে ব্যাগ পৌঁছে দিয়ে এসে দেখতেন তার আয়ের একমাত্র অবলম্বনটি সেখানে নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর গাড়ির মালিককে জানিয়ে দেন। গাড়ির মালিক থানায় জিডি করেও খোঁজ মেলে না।
মিলবে কীভাবে, অটো নিয়ে চম্পট দিয়েছে বাবুল মিয়ার চক্রের সদস্যরা। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গ্যারেজে নিয়ে পরিবর্তন করে ফেলা হতো অটোরিকশার রং। আলাদা জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া হতো ব্যাটারি। অটোচালকদের সঙ্গে নিখুঁত অভিনয় করায় সন্দেহের বাইরে থাকতেন চক্রের হোতা বাবুল মিয়া। তার এই অভিনয়ের ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন শতাধিক অটোচালক। শুধু অভিনয় নয়, রাজধানীর চারপাশে বাবুল মিয়ার গড়ে তোলা ১৫ সদস্যের চক্রটি চালকদের অজ্ঞান করেও হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কয়েকটি অটোরিকশা।
গত বুধবার রাজধানীর দক্ষিণখান ও নবাবগঞ্জ এলাকা থেকে বাবুলসহ এ চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতারের পর এ তথ্য জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন—হোতা মো. বাবুল মিয়া, জাহিদুল হাসান শিশির, শেখ সোহাগ হোসেন মিন্টু, তৈয়বুর রহমান আকন্দ, অনিক, জামাল হোসেন, জসিম খান ওরফে টোকাই জসিম, শেখ মিলন ও জাহাঙ্গীর আলম। এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি অটোরিকশা, বেশ কয়েকটি ব্যাটারি ও মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
গতকাল তাদের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হলে আদালত দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে বলে জানা গেছে।
ডিবির সূত্র জানায়, চক্রের মূল হোতা বাবুল মিয়া ১৩ বছর ধরে চুরি পেশায় রয়েছেন। দক্ষিণখান ও কামরাঙ্গীরচর এবং রাজধানীর উপকণ্ঠ নবাবগঞ্জ ঘিরে গড়ে তুলেছেন ১৫ সদস্যের চোর চক্র। বয়সে ভাটা পড়ায় অভিনয় করে অটোচালকদের নির্জন এলাকায় নেওয়ার কাজ করতেন তিনি। আগেই ঠিক করে রাখা নির্জন এলাকায় যাওয়ার পর সহযোগিতার নামে তার অভিনয়ের ফাঁদে পা দিয়ে অটোরিকশা হারাতেন চালকরা। ঘটনাস্থল থেকে নকল চাবির মাধ্যমে অটোরিকশা চুরি করে নেওয়ার কাজ করত গ্রেফতার শিশির, তৈয়বুর ও মিন্টু। অটোরিকশার রং পরিবর্তন ও ব্যাটারি কেনার কাজ করত জামাল। অটোরিকশা গ্যারেজে নেওয়ার পর মিলন ও জাহাঙ্গীর সব ধরনের সহযোগিতা করত। টোকাই জসিম কখনো চুরি আবার কখনো অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে ফেলার কাজ করত।
অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির সাইবার ও স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের ওয়েব বেইজড ক্রাইম ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) আশরাফউল্লাহ বলেন, ডিএমপি এলাকায় সন্ত্রাসী ও অজ্ঞানপার্টির সদস্য গ্রেফতার ও মাদকদ্রব্য উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার সময় চক্রটির সন্ধান পাওয়া যায়। এরা মূলত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চুরির সংঘবদ্ধ সদস্য। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে অভিনব কায়দায় কয়েক শ অটোরিকশা চুরিসহ হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
