করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে লকডাউন ঘোষণার মূল উদ্দেশ্য হইল জনসমাগম, ভিড়ভাট্টা রোধ করিয়া সংক্রমণের হার কমাইয়া লইয়া আসা। গত মাসের শুরুর দিক হইতে যখন দেশে করোনা সংক্রমণের হার হঠাত্ করিয়া বাড়িয়া যায় তখন হইতেই লকডাউন ঘোষণা করার আবশ্যিকতা দেখা দেয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকার গত ৫ এপ্রিল হইতে সাত দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচল বন্ধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি করিয়াছিল। পরিস্থিতি অনুকূলে না আসিবার কারণে ১৪ এপ্রিল হইতে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত আরো কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করিয়া সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করা হয় এবং তাহা ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। ইহার পর লকডাউনের মেয়াদ আরো দুই দফায় বৃদ্ধি করিয়া সর্বশেষ ১৬ মে পর্যন্ত লকডাউন বহাল রাখার কথা বলা হইয়াছে। তবে লকডাউনের মধ্যেও গত ২৫ এপ্রিল হইতে খুলিয়া দেওয়া হইয়াছে দোকান ও শপিংমলগুলি। আর ২২ দিন বন্ধ থাকিবার পর গণপরিবহন চলাচলের উপর হইতে তুলিয়া দেওয়া হইয়াছে নিষেধাজ্ঞা। যদিও গণপরিবহন চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ হইতে স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলিতে পাঁচ দফা নির্দেশনার কথা বলা হইয়াছে, তবে গণপরিবহন চলাচলের প্রথম দিন হইতেই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার বিষয়টি সকল পত্রপত্রিকা ও মিডিয়ার ক্যামেরায় উঠিয়া আসিয়াছে। পাশাপাশি মার্কেট, শপিংমলগুলিতে মানুষের উপচাইয়া পড়া ভিড় লকডাউনের কার্যকারিতাকেও করিয়াছে প্রশ্নবিদ্ধ।
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত যখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে দিশাহারা হইয়া পড়িয়াছে এবং যেইখানে প্রতিদিন রেকর্ডসংখ্যক আক্রান্তের পাশাপাশি হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করিতেছে, সেইখানে আমাদের দেশে চলমান লকডাউনের মধ্যেও রাস্তাঘাট, শপিংমল ও গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষার বিষয়টি আমাদের চিন্তিত না করিয়া পারে না। প্রতিবেশী দেশটির করোনার ছোবলে বিপর্যস্ত হইয়া পড়িবার ভয়ংকর দিকটি আমাদের নিকটও অশনিসংকেত প্রদান করিতেছে। লকডাউনে আমাদের দেশে সংক্রমণের হার এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়া আসিলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, আমরা এখনো করোনার করাল গ্রাস হইতে নিরাপদ নহি। ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞগণ করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কা করিতেছেন এবং ইহার পরিণতি হইতে চলিতেছে আগের যে কোনো বারের চাইতে মারাত্মক ও ভয়াবহ। দূরত্ববিধি এখন শিকায় উঠিয়াছে বাজার, শপিংমল, ব্যাংক, গণপরিবহনে। দেশে যে কোনো প্রকারের লকডাউন চলিতেছে—তাহা বুঝিতে পারা যাইতেছে না। গণপরিবহন চালুর বিষয়টি এইবার আবার ভিন্নরূপে ঘোষণা করা হইয়াছে, যেইখানে কেবল শহরের ভিতর গণপরিহন চলাচল করিতে পারিবে এবং দূরপাল্লার কোনো গণপরিবহন এক শহর হইতে অন্য শহরে চলাচল করিতে পারিবে না। বিষয়টা এমন দাঁড়ায়, যেন দূরপাল্লার গণপরিবহনেই করোনার সংক্রমণ ঘটে, শহর বা নগরে চলাচলরত গণপরিবহনে করোনা ছড়ায় না। যে বিষয়টাকে সামনে রাখিয়া দূরপাল্লার গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রাখা হইয়াছে তাহা হইল ঈদকে সামনে রাখিয়া সাধারণ মানুষ যেন ভিড় ও জনসমাগম ঘটাইয়া এক অঞ্চল হইতে আরেক অঞ্চলে চলাচল না করিতে পারে। অথচ গত কয়েক দিনে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার রিপোর্ট হইতে জানা যায়, ঈদে ঘরমুখী মানুষ এক জেলা হইতে অন্য জেলায় যাইবার গণপরিবহন না পাইয়া ভাঙিয়া ভাঙিয়া লোকাল বাসে যাতায়াত করিতেছে এবং সেইখানেও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। ইহার ফলে রাস্তায় মানুষের ভিড়ও বাড়িয়াছে এবং লোকাল পরিবহনের চাপে বিভিন্ন স্থানে তীব্র যানজটেরও সৃষ্টি হইয়াছে।
লকডাউনে যদি সর্বস্তরেই মানুষজন চলাফিরা, মিলামিশা, বিকিনিনি, সর্বোপরি জনসমাগম ঘটাইতে সক্ষম হয়, তাহা হইলে ‘লকডাউন’ শব্দটিরই গুরুত্ব কমিয়া যায়। ভবিষ্যতে যদি আবার নূতন করিয়া সংক্রমণ বাড়িয়া যায়, তাহা হইলে যথার্থই কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করিতে ‘লকডাউন’-এর আবেদন থাকিবে কি? সেই ক্ষেত্রে ‘লকডাউন’-এর পরিবর্তে নূতন কোনো শব্দ ব্যবহার করিতে হইবে তাহাও হয়তো ভাবিয়া রাখা দরকার।
