মধ্যবিত্তের কান্না

আপডেট : ০৭ মে ২০২১, ২১:৪৭

স্কুল থেকে বাসায় ফিরেই ৮ বছর বয়সি ছেলে রোহানকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন জাহিদ হোসেন। বিকেলে নিয়ে যান পার্কে। রাতে ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে বাসায় ফেরেন। ঘুমোনোর আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে গল্প। সারা দিন কত্ত মজা করেছে রোহান। গল্পটি বছর দেড়েক আগের। জাহিদ হোসেন তখন মাস শেষে নিয়মিত বেতন  পেতেন। এখন সেই আনন্দের জোয়ার নেই মধ্যবিত্ত পরিবারটিতে। করোনায় ছন্দহীন হয়ে যাওয়া এমন মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্পগুলো কারো জানা হয়। কেউ শুনতে চান না।

অদৃশ্য ভাইরাসটির হানায় টালমাটাল বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রাখতে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এই পরিস্থিতিতে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের দিন যাচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। কোভিডকালে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, সামাজিক-স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিত্তবানরা শ্রমজীবী বা নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে ত্রাণ দিলেও ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। তাদের অনেকের সংসার অচল হয়ে পড়লেও মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতেও পারছেন না। অসহায় হয়ে পড়া মধ্যবিত্তদের নিয়ে কেউ ভাবছেও না।

অনটন দেখা দিয়েছে বিশাল এই জনগোষ্ঠীর  মাঝে। হাতে বা জমানো যা অর্থ ছিল সেগুলো আগেই শেষ হয়ে যাওয়ায় ধারদেনা করে চলছেন। কিন্তু সংসারে অভাব দেখা দিলেও কাউকে বলতে পারছেন না, আবার সইতেও পারছেন না। যে কারণে অসহায় হয়ে চার দেয়ালে বন্দি হয়ে পড়েছে মধ্যবিত্তের কান্না। ছোটখাটো ব্যবসা বা চাকরি করে কোনো রকমে সংসার চলে মূলত এমন শ্রেণিভুক্ত মানুষকেই মধ্যবিত্ত বলে ধরা হয়। আমাদের দেশের  প্রেক্ষাপটে যে সমস্ত পরিবারের আয় ৪০ থেকে ৮০ হাজারের মধ্যে, তাদের আমরা মধ্যবিত্ত বলতে পারি। স্বল্প আয়ের হলেও সামাজিকভাবে খুবই ব্যক্তিত্বশীল এসব মানুষ বরাবরই আত্মসম্মান বজায় রেখে জীবনযাপন করে। মহামারির কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেকেই  চাকরি হারিয়েছেন। বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত আছেন এমন অনেকেই আবার বেতন পাচ্ছেন না। আছেন চাকরি হারানোর শঙ্কায়। সরকারের কোনো প্রণোদনার মধ্যেও নেই তারা। ফলে চলমান লকডাউনের মধ্যে মহাসংকটে পড়েছেন ‘গৃহবন্দি’ মধ্যবিত্ত মানুষ।

মূলত  দারিদ্র্যরেখার ওপরে থাকারাই মধ্যবিত্ত। সেই হিসেবে দেশের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ তারা। করোনাকালে এসব পরিবারের অনেকেই এখন নিম্নবিত্তের স্তরে নেমে আসছেন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। একদিকে আর্থিক কষ্ট, অন্যদিকে সামাজিক বাস্তবতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণিটিকে। অনেকে সংসারের খরচ কমিয়ে দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে বাসাভাড়াসহ অন্যান্য খরচের ভার সামলাতে না পেরে চলে যাচ্ছেন গ্রামে। অথচ সমাজ বিনির্মাণে এবং সমাজকে টিকিয়ে রাখতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ও দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে এই মধ্যবিত্ত  শ্রেণিই। অতএব, মধ্যবিত্তকে বাঁচাতে হবে যে কোনো উপায়ে। তাদের কষ্ট ও দুর্ভোগ লাঘবে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। একইসঙ্গে বেসরকারি উদ্যোগে যাঁরাই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চান, তাঁরা যেন লোকদেখানো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। কোনো ধরনের ছবি বা প্রচারণা থেকে বিরত হয়ে নীরবে এগিয়ে আসেন বাস্তবতার জাঁতাকালে পিষ্ট এসব মানুষের পাশে। চার দেয়ালে বন্দি মধ্যবিত্তের অনুভূতিগুলো অনুধাবন করেন। বাড়িয়ে দেন মানবতার হাত। খোঁজ নিন পাশের পরিবারে। হয়তোবা তারা আপনার অপেক্ষারই প্রহর গুনছে। কখন বলবেন, চিন্তার কারণ নেই। মানুষই তো মানুষের জন্য, আর জীবন জীবনের।

শিক্ষার্থী, এম সি কলেজ, সিলেট