সিপিডির সংলাপ
করোনার সময় দায়িত্ব এড়িয়েছে বিদেশি ক্রেতারা
ইত্তেফাক রিপোর্ট
তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের সঠিক তথ্য সংরক্ষণের জন্য কয়েক বছর আগে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের কার্যক্রম শুরু করে পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। কোনো শ্রমিক কারখানা পরিবর্তন করলে কিংবা ঐ শ্রমিকের স্বার্থে কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে এই তথ্যভান্ডার সহায়তা করবে। তবে অভিযোগ উঠেছে, ঐ তথ্যভান্ডারে শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে এবং এ কারণে এক কারখানা থেকে চাকরি হারালে আর অন্য কারখানায় চাকরি পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট শ্রমিক। গতকাল শনিবার পোশাক খাতের শ্রমিকদের প্রতি কারখানার মালিকদের জবাবদিহি-সংক্রান্ত এক সংলাপে এমন ইস্যু উঠে এসেছে। ‘করোনা মহামারিকালে পোশাক খাতে করপোরেট জবাবদিহি :শ্রমিকস্বার্থ রক্ষায় চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক ঐ সংলাপের আয়োজন করে যৌথভাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও সজাগ কোয়ালিশন। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনিশ। অনুষ্ঠানে এসংক্রান্ত জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
জরিপ প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার ইস্যুটি তোলেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। প্রতিবেদনে তিনি বলেন, কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার ভয়ে শ্রমিকেরা অনেক ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলতে পারেন না। কারণ ডাটাবেইজে (তথ্যভান্ডার) নাম এলে ঐ শ্রমিক অন্য কারখানায় কাজ পাবেন না।
একই ইস্যুতে শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিওসি) নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার বলেন, কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ এখন শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ এটি ভালো উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। কেউ ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বললে তাকে ডাটাবেইজে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। ফলে তার জন্য অন্য কারখানার দুয়ার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অন্য শ্রমিক নেতারাও ইস্যুটি তোলেন।
অবশ্য বিজিএমইএর নবনির্বাচিত সভাপতি ফারুক হাসান এমন অভিযোগের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেন, ‘তাদের কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে ৫৭ লাখ শ্রমিকের তথ্য রয়েছে। কারো কারো তথ্য একাধিকবারও এসেছে, এজন্য সংখ্যাটি এত বেশি। কিন্তু আমার জানামতে, ডাটাবেজে শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করার সুযোগ নেই। আমি জানি না, কীভাবে ব্ল্যাকলিস্ট করা হয়। তবু বিষয়টি দেখব।’
জরিপ প্রতিবেদনে করোনাকালে তৈরি পোশাক খাতে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। ঢাকা ও গাজীপুরের ১০২টি পোশাক কারখানা এবং ৪০০ পোশাকশ্রমিকের ওপর এ জরিপ চালানো হয়। জরিপে দেখা যায়, পোশাক খাতে সরকারি প্রণোদনার জন্য আবেদন করেছে ৬৮ শতাংশ কারখানা। এর মধ্যে ৬৩ শতাংশ কারখানা এই সুবিধা পেয়েছে। ১৮ শতাংশ এই সুবিধা পায়নি। যারা পায়নি, তারা মূলত ছোট পুঁজির এবং ঠিকাকাজ (সাব কন্ট্রাক্টিং) করা কারখানা। তবে সরকার প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা কিংবা লে-অফ করা-না করার শর্ত থাকলেও অনেক কারখানাই তা মানেনি। তবে ৭২ শতাংশ কারখানা দাবি করেছে, তারা করোনার সময়ে নিয়মনীতি মেনে চলেছে।
এছাড়া শ্রমিকদের স্বার্থে ৯৯ শতাংশ বিদেশি বায়ার (ক্রেতা) ও ব্র্যান্ড কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ১ শতাংশ ব্র্যান্ড শ্রমিকের চাকরিতে রাখার জন্য ক্রয়াদেশ বাড়িয়েছিল। এই সময়ে শ্রমিকের কাজের চাপ বেড়েছে, বেড়েছে হয়রানিও।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা করোনার এই সময়ে বিদেশি ক্রেতারা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি তুলে এর সমালোচনা করেন। টিপু মুনিশ নিজের কারখানার উদাহরণ দিয়ে বলেন, দুই বছর আগে যে পণ্যে ১৫ ডলার পাওয়া যেত, এখন তাতে পাওয়া যাচ্ছে ১১ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের পণ্যের দামে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটি নিয়ে কথা বলা দরকার। শ্রমিক নেত্রী কল্পনা আক্তারও বলেন, এই সময়ে ব্র্যান্ড ও বায়াররা দায়িত্বহীন আচরণ করেছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় এ সময় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) নির্বাহী পরিচালক ব্যরিস্টার সরা হোসেন, শ্রমিকনেতা বাবুল আক্তার প্রমুখ।
