বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসে ভয়াবহভাবে বিপর্যস্ত ও বিপদগ্রস্ত বিশ্ববাসী। শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বিবেচনা করিয়া এই ভয়াবহতাকে পরিমাপ করা যাইবে না। বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ক্রীড়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব সর্বব্যাপী। এই ভয়ানক পরিস্থিতি হইতে আমরা কবে মুক্তি লাভ করিব, তাহা আমরা কেহ জানি না। তবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর যে সংখ্যা তুলিয়া ধরা হইতেছে তাহা কি সঠিক? পরিসংখ্যান অনুযায়ী গতকাল পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইয়াছেন ১৫ কোটি ৭৬ লক্ষ ২৮ হাজার ৫২৬ জন। ইহাতে মৃত্যুবরণ করিয়াছেন ৩২ লক্ষ ৮৬ হাজার ৪৪৪ জন। সুস্থ হইয়াছেন ১৩ কোটি ৫১ লক্ষ ৮ হাজার ৬৮৬ জন; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড এভাল্যুয়েশনের (আইএইচএমই) সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলে বলা হইয়াছে, বিশ্ব জুড়িয়া গত দেড় বত্সরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হইয়া মারা গিয়াছেন অন্তত ৬৯ লক্ষ মানুষ যাহা বিভিন্ন দেশের সরকারি হিসাবের তুলনায় দ্বিগুণেরও অধিক। স্বাধীন স্বাস্থ্য গবেষণা সংস্থা আইএইচএমইয়ের এই পরিসংখ্যান যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি তাহা আমাদের চিন্তারও উদ্রেক করে।
আইএইচএমইয়ের প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, অধিকাংশ দেশ শুধু হাসপাতালে মারা যাওয়া রোগীদের গণনা করায় করোনায় মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা গোপন থাকিয়া যাইতেছে। এই সংস্থাটি প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে মহামারিপূর্ব সময়ে সকল ধরনের কারণে মৃত্যুর প্রবণতার সহিত মহামারির সময়ে সর্বমোট মৃত্যুর সংখ্যার তুলনামূলক হিসাব করিয়াছে যাহা যথার্থ বলিয়া আমরা মনে করি। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রে এই পর্যন্ত করোনায় অন্তত ৯ লক্ষ ৫ হাজার মানুষ মারা গিয়াছে। অথচ দেশটির রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) হিসাবে বলা হইতেছে মৃতের সংখ্যা ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার ৪৯১ জন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যে ইহা প্রযোজ্য নহে, তাহা নিশ্চয়তা দিয়া বলা যায় না। আমাদের দেশে শুরুতে যখন করোনা মহামারিতে মানুষের মৃত্যুবরণ দিনদিন বাড়িতে থাকে, তখন বেসরকারি হিসাবও প্রকাশ করা হইত। বলা হইত করোনার উপসর্গ লইয়া মৃত্যুর কথা, যাহারা হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছাইয়াছেন বা পৌঁছাইতে পারেন নাই। তাহারা করোনার টেস্ট করিয়াছেন বা করিবার সুযোগ পান নাই, তাহার পূর্বেই তাহাদের মৃত্যু হইয়াছে। একসময় এই ধরনের পরিসংখ্যান তুলিয়া ধরা বন্ধ হইয়া যায়। ইহা ছাড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো দেশে করোনার মৃত্যুর হারের সহিত সেখানে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যার খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রহিয়াছে। টেস্ট যদি কম করা হয়, তাহা হইলে অনেক মৃত্যু গোপন করা সম্ভব। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ইহা আরো অধিক সম্ভব। কেননা অশিক্ষা ও কুসংস্কারের কারণে করোনায় মৃত্যুকে অনেকে অন্য রোগে মৃত্যু বলিয়া চালাইয়া লইতে পারেন অবলীলায়। চিকিত্সাব্যবস্থার দৈন্যতার কারণেও করোনায় মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। অনেকে লোকলজ্জায় করোনায় আক্রান্ত হইবার ঘটনাও আড়াল করিতে পারেন।
এদিকে করোনা মহামারির কারণে বিভিন্ন দেশেই স্বাভাবিক চিকিত্সাব্যবস্থা ব্যাহত হইতেছে। ইহার ফলে সৃষ্ট চিকিত্সার সংকটে যেই সকল মৃত্যু হইয়াছে তাহা তো গোনায় ধরা হইতেছে না। মোটকথা, করোনায় সমগ্র বিশ্বেই ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়া চলিতেছে। ইহা হইতে মুক্তির একমাত্র পথ সচেতনতা সৃষ্টি ও স্বাস্থ্যবিধি মানিয়া চলা। যথাসম্ভব দ্রুত করোনার টিকা গ্রহণ করা। আমরা যদি করোনার ভয়াবহতা মনেপ্রাণে উপলব্ধি করিতে না পারি এবং সামাজিক দূরত্ব বজায়সহ নিয়মকানুন অনুসরণ না করিয়া চলি, তাহা হইলে এই মহাবিপর্যয় মোকাবিলা করা কঠিন।
