গতি আনবে বে-টার্মিনাল

আপডেট : ০৮ মে ২০২১, ২২:২২

প্রথমেই জানিয়ে রাখি, দেশে সমুদ্রপথে যত আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়, তার ৯৩ শতাংশই হ্যান্ডলিং করে চট্টগ্রাম বন্দর। এই বন্দরের ওপর চাপ কমাতে যে কয়েকটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে বে-টার্মিনাল তার একটি। সরকার মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্র বন্দরের টার্মিনাল তৈরির প্রকল্প নিয়েছে। পায়রা বন্দর নির্মাণের প্রকল্প করেছে। মংলা বন্দরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তবু  বে-টার্মিনালের কথা কেন আমরা বলছি? এর পক্ষে বন্দর সুবিধার অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। পায়রা, মাতারবাড়ী এবং বে-টার্মিনাল—এই তিনটি প্রকল্পের তুলনা করলে বে-টার্মিনালকে এগিয়ে রাখতে হবে। কারণ এই নয় যে, মাতারবাড়ী করা ঠিক হবে না। বরং মাতারবাড়ীতে সবচেয়ে বড় জাহাজ ভেড়ানো যাবে। মাতারবাড়ী থেকে সারা দেশের বন্দর বা টার্মিনালে পণ্য আনা-নেওয়া করা যাবে। বে-টার্মিনাল মাতারবাড়ীর মতো বড় জাহাজ না ভিড়লেও টার্মিনালটি থেকে দেশের নানা স্থানে পণ্য পরিবহন সবচেয়ে সুবিধাজনক। সেটি কনটেইনার পণ্য হোক আর খোলা জাহাজের পণ্য হোক বা প্রকল্পের সরঞ্জাম হোক। চট্টগ্রাম ইপিজেডের পেছনে সাগর পাড় থেকে রাসমনিঘাট পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার লম্বা এলাকায়  বে-টার্মিনালের জন্য বাছাই করা হয়েছে। এই দীর্ঘ এলাকা হলো চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় দ্বিগুণ। তা ছাড়া জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল হতে হবে না। ২৪ ঘণ্টাই জাহাজ আসা-যাওয়া করতে পারবে। দেশে যেভাবে শিল্পায়ন হচ্ছে, অর্থনৈতিক জোন হচ্ছে, নতুন নতুন পণ্য বা যন্ত্রপাতি আসছে তাতে এখন বিশেষায়িত পণ্য বা ভারী যন্ত্র ওঠানো-নামানোর জন্য বিশেষায়িত জেটি দরকার। দেশের কোনো বন্দরে এখন ভারী পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জেটি নেই। এ ছাড়া এলপিজি, এলএনজি টার্মিনাল, ক্যামিকেল হ্যান্ডলিং জেটি বা বিপজ্জনক পণ্য হ্যান্ডলিংসহ বিশেষায়িত পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জেটি নির্মাণ করা যাবে এই টার্মিনালে। বে-টার্মিনাল নিয়ে যেসব সমীক্ষা হয়েছে তাতে অনেক বিষয় উঠে এসেছে। মিরসরাই অর্থনৈতিক জোন থেকে বে-টার্মিনাল সবচেয়ে কাছে। মাত্র ৭০ কিলোমিটার দূরত্ব। সড়ক পথেও পণ্য পরিবহনে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। বে-টার্মিনালে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস থেকে কীভাবে জেটিতে থাকা জাহাজ রক্ষা হবে তাই নিয়ে আলোচনা আছে। জোয়ারের পানি বা ঢেউ বা জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে সমীক্ষায় স্রোত প্রতিরোধক নির্মাণের কথা বলা আছে। আগে থেকে জেগে ওঠা লম্বালম্বি একটি চরকে ব্রেকওয়াটারে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। যেটি যে কোনো জলোচ্ছ্বাস আটকাবে। এখন চীন, সিঙ্গাপুরের মতো দেশে সমুদ্রের দিকে ভরাট করেই বন্দর তৈরি করছে। সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই নতুন ও আধুনিক পদ্ধিত ব্যবহার হবে। বে-টার্মিনাল নির্মাণের জন্য সিঙ্গাপুরের পিএসআই, দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ বিশ্বখ্যাত অনেক প্রতিষ্ঠান ও সরকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দৃশ্যত কোনো অগ্রগতির খবর আমরা এখনো জানি না। এক-দুটি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করার কথা শোনা যাচ্ছে। বে-টার্মিনাল যত বড় তাতে এক-দুটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে বলে আমাদের অভিজ্ঞতা বলে না। প্রতিযোগিতার জন্য বিশ্বখ্যাত কয়েকটি অপারেটরদের হাতে দিতে হবে। প্রতিযোগিতা হলে ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাবে। ব্যবসার খরচও কমবে। এটি দ্রুত করা দরকার। করোনার কারণে পণ্য আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ায় এখন কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে। না হলে এখনই আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনে বড় সমস্যায় পড়তে হতো। বন্দর ব্যবহারকারীদের সবসময় চাওয়া হলো, জাহাজ আসার পর যেন দ্রুত জেটিতে ভিড়ে পণ্য নামিয়ে রাখতে পারে। বন্দর থেকে দ্রুত নিজের কারখানায় বা গুদামে সহজে পণ্য নেওয়াও বড় চাওয়া ব্যবহারকারীদের। একইভাবে রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণে যাতে সময় বেশি না লাগে সেটিও প্রত্যাশা রপ্তানিকারকদের। বন্দর সুবিধার সবচেয়ে বড় দুটি দিক হলো খরচ ও সময়। খরচ ও সময় যত কম লাগবে ততই বন্দরে গতি আসবে। চট্টগ্রাম বন্দরে এখন বছরের একটা সময় জট থাকে। কারণ বন্দরে এখন পণ্য পরিবহনের যে ক্যাপাসিটি আছে কয়েক বছর আগে থেকে তার চেয়ে বেশি পণ্য হ্যান্ডলিং হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে ক্যাপাসিটির বেশি হলে সেবার মান ধরে রাখা যায় না। জাহাজ জট হলে এদিকে জাহাজের ভাড়া বেড়ে যায়। বিদেশিরা চট্টগ্রামে জাহাজ পাঠাতে চায় না। কারণ জটের সময় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয় জাহাজ পরিচালনাকারীদের। এসব কারণেও নতুন টার্মিনাল দ্রুত নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। বলে রাখি, বন্দরের স্থাপনা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ৫০ বা ১০০ বছর ব্যবহারের লক্ষ্য নিয়ে করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বে-টার্মিনালে দীর্ঘমেয়াদে শিপিং ও বন্দরে যে পরিবর্তন হতে পারে তা মাথায় রেখে করতে হবে। এই টার্মিনাল হলে ৫০ বছরে বন্দর সুবিধা নিয়ে ভাবতে হবে না। এ মুহূর্তে হয়তো বে-টার্মিনালের ৬ কিলোমিটার জুড়ে জেটির দরকার নেই, কিন্তু অর্থনৈতিক জোনের সবগুলো যদি কারখানা চালু হয় তাহলে হঠাত্ করে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহনের চাহিদা বাড়বে। এখন প্রস্তুত না হলে তখন হাতে সময় থাকবে না। তাই দেশের ভাবমূর্তির পাশাপাশি অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে  বে-টার্মিনাল দ্রুত নির্মাণের বিকল্প নেই।

n লেখক :সহসভাপতি, বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডাস অ্যাসোসিয়েশন এবং পরিচালক, বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন