কুটিরশিল্প

হাতপাখা

আপডেট : ০৯ মে ২০২১, ২১:২৯

 

‘এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালি তালপাখাটা খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো।’

অভাজনের অপারগতা, পত্র দেবে কী করে! বৈদ্যুতিক পাখা আর আলোর ঝলকানিতে তালপাখা নিজেই অভিমানে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেছে যে!

পাখা একটি প্রাচীন কারুশিল্প।

পনেরো শতকে চীনে একটি বড় গাছের পাতা থেকে মানব মস্তিষ্কে হাতপাখার ধারণা আবির্ভূত হয়। চীনা ভাষায় ‘সান জ্যে’ মানে হাতপাখা। ধীরে ধীরে এটি আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। জাপানিজদের সংস্কৃতিতেও মিশে  যায় একসময়। প্রথমে তারা আমদানি করত চীন থেকে। রাজন্যবর্গীয়দের উপহার হিসেবে এর প্রচলন শুরু হলেও জাপানিজদের বিখ্যাত চা উত্সবে জনসাধারণের হাতে পৌঁছে।

আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ইউরোপে হাতপাখার ব্যবহার শুরু হয়, তারা আমদানি করত চীন ও জাপান থেকে। ভারতে এর আবির্ভাব ইউরোপীয়দের হাত ধরে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দলে দলে ইংরেজরা এদেশে আসা শুরু করল। কিন্তু জন্ম থেকে ব্রিটেনের ঠান্ডা ও সেঁতসেঁতে আবহাওয়ায় অভ্যস্ত প্রাণ  দাপুটে গ্রীষ্মের দাবদাহে কুপোকাত। তখন শুরু হয় পাখাওয়ালার চল। লম্বা ঝালর বসানো পাখা মাটিতে ভর দিয়ে তাকে খাড়া করে রাখা হতো।

মুঘল অমাত্যদের বাড়ির অন্দর মহলের কাহিনিকাব্যে টানাপাখার কথা পাওয়া যায়। তাদের আমলেই পাখা অলংকারিক শিল্পের রূপ লাভ করেছে। পরে উত্তর ভারতের পথ ধরে বাঙাল মুলুকে আগমন। প্রযুক্তির মোক্ষম চালে টানাপাখার অবসান হলেও  হাতপাখার আবেদন সর্বজনীন। 

ঐতিহাসিক এইচ ই বাস্টিড তাঁর Echos from old Calcutta (১৯০৮) বইতে কলকাতার টানাপাখার কথা লিখেছেন। ১৯২৪ সালে ই এম ফস্টার A passage to India উপন্যাসে  পাখাওয়ালার বিবরণ দিয়েছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে পশুর চামড়ার তৈরি অলংকৃত হাতপাখার সন্ধান পাওয়া যায়। ব্যবহূত হতো মনি-মুক্তো, হাতির দাঁত, অ্যামবুস আর বাটিকের নকশা। গাছের ডাল আর পশুর হাড় দেওয়া হতো হাতলে। সোনারূপা খচিত হাতপাখায় ফুটিয়ে তোলা হতো বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক চেতনা, ধর্মীয় কাহিনি, ফুল-লতাপাতার নিপুণ নকশা।

বাঙালি গ্রামীণ জনপদের সঙ্গে পাখার সম্পর্ক নিবিড়।

ছোটবেলায় ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলে চাঁদের আলোয় আমরা কানামাছি খেলতাম। ‘কানামাছি ভোঁ ভোঁ, যারে পাবি তারে ছোঁ’ খেলতে গিয়ে ঘেমেনেয়ে যখন একাকার, তখন দাদু ‘বিচুন’ দিয়ে বাতাস করতেন। আঞ্চলিক ভাষায়  হাতপাখাকে ‘বিচুন’ বলে। মাঠে কাজ করা মজুর-মুটে-কুলির জন্য গামছায় বাঁধা ভাতের সঙ্গে একটা তালপাতার বিচুন ঘাম ঝরানো রোদেলা দুপুরে একরত্তি হিম পরশ। কোথাও কোথাও দেখেছি সন্ধ্যায় বাচ্চা শীতলপাটিতে কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসেছে। স্লেট-চকের সঙ্গে একটা হাতপাখাও থাকত। কুপির টিমটিমে আলোয় ধিমিধিমি বাতাস, বেগ বাড়লেই কুপি নিভে যায়।

অবসরে মা-চাচিরা কাপড়ে নকশা করে পাখার কাজ করতেন। হরেক রকম আঁকিবুঁকি, নানান কারুকাজ। শঙ্খলতা, কাঞ্চনমালা, চৌখুপী, মানবাহার, মানবিলাসী...বাহারি সব নাম! সুতোর বুননে ফুটিয়ে তুলতেন—‘পাখা আমার প্রাণের সখা,/  শীতকালে থাকে একা/ গরমকালে দেয় দেখা।’

শুধু গরমকালে দেখা দিলেও গ্রাম্যবধূর জীবনে পাখাই ভরসা। ইলেকট্রিকের যুগ এ দায় থেকে মুক্তি দিলেও মুক্তি মেলেনি গরম আর লোডশেডিং থেকে। তাই হাতপাখা মানে স্বস্তির নিশ্বাস।