বাড়িতে ঢুকে শুনলাম মা গুনগুন করে কাঁদছেন। ‘গুনগুন’ বললাম কারণ আমার মা কাঁদেন চিকন সুরে, অনেকটা বাঁশির মতো মনে হয়। মা প্রায়ই কাঁদতে বসেন, তাই এটা তেমন নতুন ঘটনা নয়। তবে আজকের ঘটনা ভিন্ন। আব্বা সামনের বারান্দায় আরামকেদারায় চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন।
আমার দরজা খোলার আওয়াজ পেলেন বোধহয়। পুরোনো দিনের কাঠের দরজা, খুলতে গেলে ‘ক্যাক’ করে বিশ্রী শব্দ হয়। মজনুকে বলেছি একটু নারকেল তেল লাগিয়ে দিতে, তাহলে কর্কশ শব্দটা আর হবে না। মজনু আমাদের দোকানে কাজ করে, সে দরজায় তেল দেয়নি, কাজ আর করে কই, শালার যত অকাজ! কাজের বেলায় কোনো খোঁজ থাকে না! জিজ্ঞেস করলেই মাথা চুলকে বলবে, করে দিবানি মেজ ভাই!
ঘরে ঢুকতেই আব্বা চোখ মেলে আমাকে দেখলেন। তারপর চোখ বন্ধ করে ফেললেন। চোখ বন্ধ করেই আমাকে বললেন, আয়াজ, খবর শুনেছিস নাকি?
আমি সোফায় বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলাম, না তো, কী হয়েছে? জানি না তো!
—মুন্নি আসবে নাকি ও বাড়িতে!
—ওহ, তা আসবে না? ওটা তো মুন্নি আপারই বাড়ি, এখন হয়তো বিদেশ থাকে। কিন্তু বাড়িটা তো তারও।
আব্বা সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, হুম!
মায়ের কান্নার কারণ বোঝা গেল। মুন্নি আপা আসবে! আব্বাও এজন্য চুপচাপ। সত্যি বলতে আমারও একটা চাপা কষ্ট হতে লাগল। মুন্নি আপা থাকেন ডালাসে। আপার স্বামী ওখানেই বাড়ি করেছেন নাকি।
মুন্নি আপা প্রায়ই বাড়ির পাশের লেকে বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যান। আপার বাচ্চারা ধবধবে সাদা রাজহাঁসের সাথে ছবি তোলে, আপা ফেসবুকে আপলোড করেন। মাঝে মাঝে চমত্কার সব খাবার তৈরি করেন, হ্যাশট্যাগ দিয়ে কুকিং, হবি, প্যাশন লিখে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেন, আমি দেখি কিন্তু আব্বা আম্মাকে কখনো বলি না।
মুন্নি আপার সাথে আমাদের খুব কষ্টের একটা স্মৃতি আছে। কী দরকার খুঁচিয়ে কষ্ট বাড়িয়ে দেওয়ার।
আজকের কথা ভিন্ন। মুন্নি আপা আসবেন, তাই এখানে তো কষ্ট বাড়ানোর বিষয়ে আমার কোনো দায় নেই। কিছু কষ্ট সারাজীবনেও প্রশমিত হয় না।
দু’দিন পরে তিনদিনের দিন বিকেলে দেখলাম একটা সাদা মাইক্রো বাড়ির উঠানে, মুন্নি আপার বাড়ির সামনে। মানে আপা এসেছেন। আমার চোখ চলে গেল উঠানের অপর দিকে, বাগানের শুরুতে ছাতিম গাছের নিচে একটা বাঁধানো কবর। আমার ভাইয়ার কবর! যে নিজে নিজেই মরে গিয়েছিল বছর পনের আগে, একদিন বিকেলে।
থাক সেসব কথা, মুন্নি আপা এসেছেন, আপার সাথে দেখা করতে যাওয়া উচিত। হাজার হোক, আপা দেশের বাইরে থাকেন। পুরোনো সব কথা মনে রাখতে নেই। তাই গেলাম দেখা করতে আপার বাড়িতে।
মুন্নি আপা আমার মেজ চাচার বড় মেয়ে। পাশাপাশি বাড়ি আমাদের। এ বাড়িতে আজ উত্সবের আমেজ। তিন্নি তপার আনন্দ বোঝা যাচ্ছে। মেজচাচী হাসিমুখে পান চিবুচ্ছেন। বাড়িটা যেন আনন্দে ঝলমল করছে। বিপরীতে আমাদের বাড়িটা যেন একদম মিইয়ে আছে, একদম চুপচাপ, সুনশান। কোনো আওয়াজ নেই, আলোও জ্বললেও নিষ্প্রভ, নিষ্প্রাণ।
মুন্নি আপা সামনে এলেন আমার সাথে দেখা করতে।
—আয়াজ, কেমন আছিস?
—জি ভালো আপা, তুমি কেমন আছ?
আপার তিনটে বাচ্চা ঘরময় ছুটে বেড়াচ্ছে। আপা ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, বুঝতেই পারছিস, কেমন আছি! ভেবেছিলাম দেশের বাইরে এরা জন্মেছে, দেশে এসে আনন্দ পাবে না। কোথায় কী, কীভাবে খেলছে দেখো!
আমি ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটিয়ে বললাম, তা-ই তো দেখছি!
—জানো না তো, আমাকে অস্থির করে দেয়! একেক জনের একেক ফরমায়েশ। সারাদিন কোথা দিয়ে কেটে যায় আমি টের পাই না।
—তুমি কোনো জব করো? শুনেছি দেশের বাইরে সবারই কিছু না কিছু করতে হয়?
—না রে, আমি জব করতে পারি না। এই তিনজনকে সময় দিয়ে আমার জব করার মতো কোনো সময় থাকে না। আর ওদের বাবা বলেছে, তোমার কাজ করতে হবে না। তাহলে ওরা কাউকে কাছে পাবে না। ধরে নাও ওদের বড় করাই তোমার কাজ।
—হ্যাঁ, ভালোই তো বলেছে!
—হুম, লোকটা খুব ভালো রে!
—সে আসেনি?
—এসেছে, আব্বার সাথে কোথায় যেন গেল।
—ওহ আচ্ছা।
—তুই কী করিস এখন? এলাকা ছেড়ে কোথাও গেলি না?
—আমি আব্বার দোকানেই বসি, কোথায় আর যাব, আমি গেলে আব্বা আম্মা একা হয়ে যাবেন, তাদের কে দেখবে, বয়স বেড়েছে দুজনেরই।
মুন্নি আপা বললেন, হুম। একটু থেমে বললেন, মানুষ বেঁচে থাকলেই তার বয়স বাড়ে, বুড়ো হয়। মরে গেলে আর কারো বয়স বাড়ে না ।
মুন্নি আপার সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা হলো। আপার বর্ণিল প্রবাসজীবনের গল্প শুনলাম। আপা এসেছেন বলে বাড়িতে পিঠা-পায়েসের ছড়াছড়ি, তার ভাগও পেলাম। আপা বললেন, আয়াজ, রাতে খেয়ে যা না ভাই!
আমি আজ নয় বলে এড়িয়ে গেলাম। অনেক কিছু বদলে গিয়েছে। ছিপছিপে কিশোরী মুন্নি আপা এখন বেশ ভারী চেহারার তিন সন্তানের মা। আপার চেহারায় কোথাও কোনো কষ্টের ছাপ নেই, ঝলমলে আলোর মতোই আপার হাসিমাখা মুখ। আরো কিছুক্ষণ বসে চলে এলাম বাড়িতে। বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই আমার চোখ চলে গেল উঠানের কোণে, বাগানের শুরুতে ছাতিম গাছের নিচে একটা বাঁধানো কবর। আমার ভাইয়ার কবর! যে নিজে নিজেই মরে গিয়েছিল বছর পনেরো আগে, একদিন বিকেলে!
মুন্নি আপা আর আমার ভাইয়া সমবয়েসি, চাচাতো ভাইবোন। একই সাথে বেড়ে ওঠা আমাদের। আমি বেশ কয়েক বছরের ছোট তাদের চাইতে। তিন্নি, তপা আমার চাইতেও ছোট। মুন্নি আপা আর ভাইয়া ক্লাস টেনে পড়ার সময় একসময় আবিষ্কৃত হলো, তারা চাচাতো ভাইবোন—এই সম্পর্কে আটকে নেই। দুজনের মধ্যে অন্য কোনো একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিষয়টা নিয়ে অনেক ঝামেলা হলো। খুবই অস্বস্তিকর বিষয়, ভাইয়া ঘোষণা করল, সে মুন্নি আপাকে বিয়ে করবে। এই ঘোষণার জন্য সে মারও খেলো আব্বার হাতে, তাতে সমস্যা কমলো না। পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল, দুই পরিবারের মুখ দেখাদেখি বন্ধ প্রায়। এর মাঝে একদিন ভাইয়া আব্বার ক্যাশ বাক্স থেকে দশ হাজার টাকা আর মুন্নি আপাকে নিয়ে কোথাও চলে গেল। সম্ভাব্য সকল জায়গায় তাদের খোঁজা হলো, কিন্তু পাওয়া গেল না। দু’ দিন পরে খুলনার এক হোটেল থেকে তাদের উদ্ধার করা হলো।
এই ঘটনার পরে মুন্নি আপাকে আর বাড়িতে আনা হলো না। ওখান থেকেই ঢাকায় আপার মামার বাড়িতে রেখে আসা হলো। ভাইয়া ফিরে এল বাড়িতে। সব ঠিকঠাক চলছিল। টেস্ট পরীক্ষার পরে একদিন জানা হলো, মুন্নি আপার বিয়ে হয়ে গেছে, ঢাকায় বসেই। পাত্র আমেরিকায় থাকে, মুন্নি আপাকে নিয়ে যাবে। সবার সাথে ভাইয়াও শুনল, কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বিকেলের দিকে ভাইয়া নিজের ঘরে ফ্যানের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল।
সবাই যখন টের পেল, তখন সব শেষ!
রাত বাড়ছে। হয়তো বারোটার কিছু বেশি হবে। নানা চিন্তায় ঘুম আসছে না বলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়েছিলাম। মনে হলো ভাইয়ার কবরের পাশে কেউ একজন!
আমার ভয়-ডর বরাবরই কম। টর্চ নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে বললাম, কে? কে ওখানে?
আলো ফেলতেই দেখি মুন্নি আপা। আপা বিব্রত বা ইতস্তত হলেন না। আপার চোখ ভেজা। আমাকে দেখে বললেন, তোকে তখন বললাম না, মরে গেলে বয়স বাড়ে না। দেখ না, আজাদের বয়স আর বাড়ছে না, চাচা-চাচি বুড়ো হচ্ছেন, তুই আমি বড় হচ্ছি, আজাদ পনেরো বছরেই আটকে আছে।
আজাদ খুব অন্ধকারে ভয় পেত, জানিস, এখন ওর ভয় করে না আয়াজ? কীভাবে একা একা এই অন্ধকারে শুয়ে আছে?
মাথা নিচু করে রইলাম, কোনো উত্তর দিতে পারলাম না মুন্নি আপাকে। কিছু প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না, কোনো উত্তর হয় না।
