পাওলো কোয়েলহোর তিনটি নীতিগল্প

আপডেট : ০৯ মে ২০২১, ২১:৩৫

অনুবাদ :জাভেদ ইকবাল

আনন্দের বৃত্ত

প্রাচীন একটা গল্প আছে এমন : একদিন সকাল-সকাল একজন কৃষক মঠের সদর দরজায় জোরে জোরে করাঘাত করল। পাহারায় থাকা ভিক্ষুটি যখন দরজা খুলল, কৃষক তার হাতে চমত্কার একগুচ্ছ আঙ্গুর তুলে দিল।

—ভ্রাতা, এগুলো আমার বাগানের সর্বোত্কৃষ্ট আঙ্গুর। এই এক থোকা আঙ্গুর আমি উপহারস্বরূপ নিয়ে এসেছি। 

—ধন্যবাদ! এগুলোকে এক্ষুনি আমি মঠাধ্যক্ষের কাছে নিয়ে যাচ্ছি; এই উপহারে তিনি নিশ্চয়ই চমত্কৃত হবেন।

—না! এই উপহার আমি শুধুমাত্র আপনার জন্য এনেছি। কেননা, আমি যখনই মঠের দরজায় করাঘাত করি, সর্বদা আপনিই দরজা খুলে দেন। অনাবৃষ্টি আর খরায় যেবার আমার সব ফসল নষ্ট হয়ে গেল, তখন প্রতিদিন এক কাপ মদিরা আর একটা করে রুটি দিয়ে আপনিই আমাকে সাহায্য করেছেন। 

এরপর সারাটা সকাল সেই একগুচ্ছ আঙ্গুরকে হাতে ধরে প্রহরী-ভিক্ষুটি ফলগুলোর প্রশংসায় পঞ্চমুখ রইল। তবে শেষপর্যন্ত সে সিদ্ধান্ত নিল, চমত্কার এই ফলের থোকাটি সে মঠাধ্যক্ষকে উপহার দেবে, কেননা তিনি সর্বদা তাঁর জ্ঞানের বাক্য দিয়ে ভিক্ষুদের অনুপ্রাণিত করে আসছেন।  

মঠাধ্যক্ষ এই উপহার পেয়ে দারুণ খুশি হলেন; তবে মঠে একজন অসুস্থ ভ্রাতা রয়েছে—স্মরণে এনে তিনি ভাবলেন :

‘এই আঙ্গুর আমি অসুস্থ ঐ ভ্রাতাকে উপহার দেবো। কে জানে, এতে করে তার মনে সামান্য হলেও আনন্দের ঢেউ জাগতে পারে।’ 

মঠাধ্যক্ষ তার ভাবনামতো কাজ করলেন। তবে এই আঙ্গুরগুচ্ছ সেই অসুস্থ ভ্রাতার ঘরেও বেশিক্ষণ থাকল না, কেননা তিনি চিন্তা করলেন:

‘রান্নার কাজে নিযুক্ত ভিক্ষু-ভ্রাতা দীর্ঘদিন ধরে আমার সেবা করে আসছে, আমাকে এখানকার সেরা খাবারটাই মুখে তুলে দিচ্ছে। আমি নিশ্চিত, এই আঙ্গুরগুলো সে দারুণভাবে উপভোগ করবে।’ 

আঙ্গুরের সৌন্দর্যে বাবুর্চি বিমোহিত হয়ে পড়ল। তবে সে ভাবল যে, মঠের তত্ত্বাবধায়কই অত্যুত্কৃষ্ট এই উপহারের যথাযথ কদর করতে সক্ষম হবেন। মঠের অনেক ভ্রাতা তাদের মঠ তত্ত্বাবধায়ককে একজন পুণ্যাত্মা বলেই জ্ঞান করে; তিনিই প্রকৃতির এমন আশ্চর্য সুন্দর ফলের প্রকৃত মূল্যায়ন করার যোগ্যতম ব্যক্তি।    

চমত্কার এই উপহার পাবার পর মঠ-তত্ত্বাবধায়ক আঙ্গুরগুচ্ছকে মঠের কনিষ্ঠতম শিক্ষার্থী’র হাতে তুলে দিলেন, যাতে করে সে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৃষ্টির মধ্যে ঈশ্বরের যত্নের ছোঁয়া উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।

শিক্ষার্থীটি যখন এই দারুণ উপহারটি হাতে পেল, সে স্মরণ করল তার সেই প্রথম দিনটার কথা যেদিন সে এই মঠে এসেছিল। সেদিন প্রহরায় থাকা যে ভিক্ষু-ভ্রাতা দরোজা খুলে দিয়েছিলেন, তার আমন্ত্রণেই সে এই ঘরানার মানুষদের সংস্পর্শে আসতে পেরেছে—যারা জীবনের চমত্কারিত্বকে সত্যিকার অর্থে মূল্যায়ন করতে জানেন।   

আর তাই, রাত নেমে আসার ঠিক আগ মুহূর্তে, কনিষ্ঠতম ভিক্ষু আঙ্গুরের থোকাটি নিয়ে প্রহরায় থাকা ভ্রাতার নিকট হাজির হলো। 

ভ্রাতার হাতে আঙ্গুরের গুচ্ছটি তুলে দিয়ে সে বলল :‘আনন্দের সাথে এর স্বাদ উপভোগ করবেন। কেননা দিনের বেশিরভাগ সময় আপনি এখানে একা, নিঃসঙ্গ সময় কাটান; এই আঙ্গুরগুলো নিশ্চয়ই আপনাকে খুশি করে তুলবে।’ 

ভিক্ষুটি বুঝতে পারল, এই ফলগুলো তার জন্যই নিয়তি-নির্দিষ্ট উপহার। তাই, রাতে ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে অত্যন্ত আনন্দের সাথে প্রতিটি আঙ্গুরের স্বাদ গ্রহণ করল।

এভাবেই বৃত্তটি পূর্ণ হলো : আনন্দ ও শান্তির বৃত্ত—যা সবসময় উদারমনা মানুষদের চারপাশে জ্বলজ্বল করে।

বড় বোনের প্রশ্ন

সা-চি গ্যাব্রিয়েলের যখন ছোট্ট একটা ভাই হলো, তার বাবা-মাকে সে অনুরোধ করল : ভাইটিকে তার কোলে দিয়ে তারা যেন ওকে একটু একা থাকতে দেন। কিন্তু চার বছরের অনেক শিশুর মতো তাদের মেয়েটা হয়তো ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে, আর সেই কারণে ছোট্ট ভাইটার সাথে সে খারাপ কিছু ঘটাতে পারে—এমন আশঙ্কায় বাবা-মা সা-চি’র এই প্রস্তাবে রাজি হলেন না।

কিন্তু সা-চির মধ্যে ঈর্ষান্বিত হবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। বরং প্রথম দিন থেকেই তার ছোট্ট ভাইটির জন্য সে অপার স্নেহকাতরতার পরিচয় দিয়েছে। আর তাই, ওর বাবা-মা একটা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। তারা দুজনে নবজাতক ছেলেকে সা-চির কাছে রেখে বাইরে গেলেন। তবে ঘুমানোর ঘরের দরজাটা তারা এমনভাবে খোলা রাখলেন যেন সা-চি কী করে তারা তা বাইরে থেকেও অবলোকন করতে পারেন।

ওর আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবার আনন্দে ছোট সা-চি গুটি গুটি পায়ে ভাইটির দোলনার কাছে গেল, উপুড় হয়ে দোলনার ভেতরে থাকা ভাইকে বলল :

‘ছোট্ট ভাইটি আমার, আমায় বলো দেখি, ঈশ্বর কেমন। আমি-না তা ভুলে যেতে বসেছি।’

যা চাই তা কীভাবে করব

মৃত্যুবরণের সাথে সাথেই জুয়ান নিজেকে আবিষ্কার করল অতি মনোরম একটা জায়গায়, যেখানে তার সারাজীবনভর স্বপ্ন-লালিত সকল প্রকার সৌন্দর্য, আরাম আর আয়েশ বিদ্যমান। সেখানে সাদা পোশাকে একজন লোক তার কাছে এসে বলল:  ‘তুমি এখানে যা কিছু আকাঙ্ক্ষা করবে তা-ই পাবে : যে কোনো খাবার, আনন্দ অথবা বিনোদন।’

মহা আনন্দিত জুয়ান সেখানে তার সব স্বপ্ন আর আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে শুরু করল। এভাবে অনেক বছর আনন্দের জীবন যাপন করে, একদিন সে সাদা পোশাকধারীর কাছে গিয়ে বলল :

‘আমার আকাঙ্ক্ষার সবকিছুই আমি ইতিমধ্যে পূরণ করে ফেলেছি। এখন আমার একটা কাজ দরকার, যাতে করে আমি নিজেকে প্রয়োজনীয় একজন ব্যক্তি বলে মনে করতে পারি।’

‘আমি দুঃখিত’, সাদা পোশাক পরিহিত লোকটি বলল। ‘ঐ একটিমাত্র জিনিসই আমি তোমার জন্য জোগাড় করতে অক্ষম; এখানে করবার মতো কোনো কাজ নেই।’

‘কী ভয়ানক!’ বিরক্তিভরে জুয়ান বলল। ‘এই ক্লান্তিকর একঘেয়েমি নিয়ে আমাকে অনন্তকাল পার করতে হবে? এর থেকে আমি হাজার বার নরকবাস বেছে নেবো।’

লোকটি এবার জুয়ানের কাছে এসে, নিচুস্বরে জিজ্ঞাসা করল:

‘তো তোমার ক ধারণা, তুমি কোথায় আছো?’