থামছে না মানুষ

আপডেট : ০৯ মে ২০২১, ২২:৪৯

করোনা আতঙ্ক, পদে পদে বাধা, বেশি ভাড়া আর ফেরি বন্ধ জেনেও ঝুঁকি নিয়েই ঈদে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় বিকল্প বাহনে তারা যাচ্ছেন গন্তব্যে। কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না যাত্রীদের বাড়ি যাওয়া। আগের কয়েকদিনের মতো গতকাল রবিবারও ঘরমুখী যাত্রীদের ঢল নামে নৌপথে। বিজিবির চেকপোস্ট উপেক্ষা করেই ভোর থেকে পদ্মা পাড়ি দিতে দক্ষিণবঙ্গগামী হাজার হাজার মানুষ শিমুলিয়া ঘাটে যান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভিড় আরো বাড়তে থাকে। নৌপথ ছাড়াও পাশাপাশি যাত্রীর চাপ বেড়েছে ঢাকা-টাঙ্গাইল এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। গত ২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়েছে কমপক্ষে ৫০০ দূরপাল্লার বাস। আকাশপথেও যাত্রীর চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে। ফ্লাইট বাড়িয়েও সামলানো যাচ্ছে না।

মাওয়া নৌ-পুলিশ স্টেশনের ইনচার্জ জে এম সিরাজুল কবির বলেন, ভোররাত থেকে ফেরি চলাচল বন্ধ। ফেরি বন্ধের নির্দেশনার পরও প্রচুর যাত্রী শিমুলিয়া ঘাটে আসছে। ফেরিতে উঠতে না পেরে অনেকে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইঞ্জিনচালিত ছোট ছোট ট্রলারে করে পদ্মা পার হওয়ার চেষ্টা করে। এমন ১২টি ট্রলার আটক করে নৌ-পুলিশ। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার প্রবেশদ্বার মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌপথে গতকাল সকাল থেকে সাধারণ পরিবহনবাহী ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। ফলে ঈদ উপলক্ষ্যে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপও কম দেখা গেছে। তবে দুটি ফেরি দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি পণ্যবাহী যান পারাপার করা হয়।

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা ফেরি বন্ধ রেখেছি। কিন্তু জরুরি যানবাহন অর্থাত্ অ্যাম্বুলেন্স বা রোগী পরিবহনের গাড়ি পারাপারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সমস্যা হয়েছে কোনো ফেরি ঘাটে ভেড়ামাত্রই হাজার মানুষ সেটাতে উঠে পড়ছে। অথচ যে অ্যাম্বুলেন্সটি নেওয়ার জন্য ঘাটে ফেরিটি ভিড়েছে, সেটি আর উঠতে পারছে না।

মানুষের চাপে মাওয়া ফেরিঘাটে বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়। এতে অক্সিজেনের অভাবে একটি শিশু মারা যায় বলে খবর পাওয়া গেছে। মাওয়া ঘাটে নারায়ণগঞ্জ থেকে খুলনাগামী যাত্রী রেহেনা আক্তার বলেন, ‘ছেলেমেয়ে নিয়া ঘাটে দুই ঘণ্টা বসা ছিলাম। ভিড় ঠেলে ফেরিতে উঠতে গিয়ে আমি পন্টুনে পড়ে যাই। মানুষের চাপ আর পায়ের আঘাতের কষ্ট নিয়েও হাল ছাড়ি নাই। ফেরিতে উঠে পার হইছি। এখন ভাড়া বেশি হলেও ভালোভাবে বাড়ি যাইতে পাড়লে হয়।’

বিজিবির চেকপোস্ট উপেক্ষা করেই ঘাটে মানুষ :বিজিবি চেকপোস্ট সত্ত্বেও  ভোরে দক্ষিণাঞ্চলগামী হাজার হাজার মানুষ শিমুলিয়া ঘাটে যান। বিআইডব্লিউটিসি রাতভর ১৫টি ফেরি দিয়ে পারাপার করলেও ভোর থেকে পারাপার বন্ধ করে দেয়। তবে আটটি অ্যাম্বুলেন্সসহ সকাল পৌনে ৮টার দিকে ফেরি ফরিদপুর ১ নং ঘাট থেকে ছেড়ে যায়। ফেরিটিতে উঠার জন্য যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ভরে যায় ফেরিটি। ফেরিতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। এ সময় পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে ফেরির ঢালা উঠানোর ব্যবস্থা করে। পরে ১০টার দিকে ফেরি শাহ পরান ঘাটে আসলে হাজার হাজার মানুষ ফেরিতে উঠে যায়। এছাড়া জীবনের  ঝুঁকি নিয়েই জেলে নৌকাসহ ট্রলারে যাত্রীরা পদ্মা পার হওয়ার চেষ্টা করে। নৌ-পুলিশ এ পর্যন্ত ১২টি ট্রলার আটক করেছে।

বিআইডব্লিউটিসির সহকারী মহাব্যবস্থাপক  সফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দিনের বেলায় ফেরি বন্ধ। শুধু জরুরি কারণে কিছু যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। সেই ফেরিতেই লোকজন স্রোতের মতো উঠে যাচ্ছে। করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেও লোকজন নাড়ির টানে ছুটছেন, কোনো বাঁধাই মানছেন না। বহরের ১৬ ফেরির মধ্যে দুই-তিনটি ফেরি চলাচল করছে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মনিরুজ্জামান তালুকদার জানিয়েছেন, করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি থেকে জনসাধারণকে রক্ষায় ঈদে ঘরমুখী না হওয়ার জন্যই পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।  তারপরও লোকজনের ঢল নামছে, তাই দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বিজিবি পথে ব্যারিকেড তৈরি করে মানুষকে আটকানোর চেষ্টা করলেও ভিন্ন পথে তারা ফেরিঘাটে যাচ্ছেন।

প্রায় যাত্রীশূন্য পাটুরিয়া ফেরিঘাট : মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌপথে গতকাল সকাল থেকে সাধারণ পরিবহনবাহী ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ঘাটে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপও কম দেখা গেছে। মানিকগঞ্জে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কসহ তিনটি পয়েন্টে ফেরিঘাটগামী যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করছে বিজিবি। ঢাকা-পাটুরিয়া মহাসড়কের বারবারিয়া ও টেপড়া বাসস্ট্যান্ড এবং ঢাকা-হেমায়েতপুর সিংগাইর আঞ্চলিক মহাসড়কের ধল্লা এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।  ফলে যাত্রীর কোনো ভিড় নেই ঘাটে।

যাত্রীর চাপ মহাসড়কেও :নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, চিটাগাং রোড, মদনপুর, সোনারগাঁও থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে দূরপাল্লার বাস। পাশাপাশি দিনরাত মাইক্রোবাস সার্ভিস দিয়ে অন্য জেলায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে যাত্রীদের। এজন্য যাত্রীদের থেকে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কতিপয় পুলিশ সদস্যকে টাকা দিয়ে গণপরিবহন ও মাইক্রোবাস চলাচল করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন অলিগলিতে রাখা হয় দূরপাল্লার বাস, রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে পরিবহনগুলো দ্রুত বাস কাউন্টারের সামনে চলে আসে। প্রতিটি সিটে এক জন করে যাত্রী তোলেন লাইনম্যান। অনেকে দিনে এসে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে সিট বুকিং করে রাখে সামনের সিটের জন্য। রাত ৮টা থেকে ১২টার মধ্যে গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায় বাসগুলো।

ভাড়া বেশি কেন জানতে চাইলে লাইনম্যান বলেন, ট্রাফিক পুলিশকে ৫০০ টাকা দিলেই হয়। তবে মেঘনা ব্রিজের সামনে যে পুলিশ থাকে, তাকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। তাই টিকিটের ভাড়া বেশি এবং সব সিটে যাত্রী থাকে।

হাইওয়ে পুলিশের কাঁচপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, দূরপাল্লার বাস মহাসড়ক দিয়ে যাতে যেতে না পারে, সে জন্য হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়েছেন। রাতে যেসব দূরপাল্লার বাস যাত্রী নিয়ে চলাচল করে, সেগুলো আটক করা হয়। তবে একসঙ্গে কয়েকটি গাড়ি থাকলে সব তো ধরা যায় না। আর টাকা নেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। আমরা সরকারি নির্দেশনা মেনে কাজ করছি।’

২৪ ঘণ্টায় বঙ্গবন্ধু সেতু পার হয়েছে ৫০০ দূরপাল্লার বাস :নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে রাত থেকে ভোর পর্যন্ত দূরপাল্লার বাস চলাচল করছে। বঙ্গবন্ধু সেতু টোলপ্লাজা সূত্র জানায়, শনিবার সকাল ৬টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৬ হাজার বিভিন্ন ধরনের যানবাহন পারাপার হয়েছে। এর মধ্যে ৫০০ যাত্রীবাহী দূরপাল্লার বাস রয়েছে। এতে মোট ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা টোল আদায় হয়েছে।

এ ব্যাপারে এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইয়াসির আরাফাত জানিয়েছেন, অনেক বাস ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে জেলাভিত্তিক গণপরিবহন ছাড়া অন্য জেলার বাসগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আকাশপথেও যাচ্ছে মানুষ :করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে বন্ধ রয়েছে দূরপাল্লার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ চলাচল। তবে সীমিতসংখ্যক অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চালু আছে। ঈদে ঘরমুখী মানুষ তাই ছুটছেন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের টিকিটের জন্য। যাত্রীদের চাপ সামলাতে বাড়তি ফ্লাইট চালাতে হচ্ছে দেশি এয়ারলাইনসগুলোকে। যদিও তাদের ছয়টি বিমানবন্দরে ১৮টি ফ্লাইট পরিচালনার সংখ্যা বেঁধে দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতি বছরই আকাশপথে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ফ্লাইটের চাহিদা বাড়ে। তবে এ বছর যাত্রীদের চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। এয়ারলাইনস ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলো জানিয়েছে, প্রতিনিয়ত টিকিটের জন্য যোগাযোগ করছেন যাত্রীরা, কিন্তু চাহিদা অনুপাতে ফ্লাইট না থাকায় টিকিট দিতে পারছেন না তারা। ১০ থেকে ১২ মে পর্যন্ত বিভিন্ন গন্তব্যের প্রায় সব টিকিট ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন :মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি, শিবালয় (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) সংবাদদাতা ও ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা।