নিকট ইতিহাস থেকেও ভারতের শেখার আছে

আপডেট : ১৬ মে ২০২১, ২১:৪৭

ভারতের গঙ্গায় শব ভাসছে। একটা-দুটো নয়, শত শত শব। যেই গঙ্গাতে থুতু ফেলা অপরাধ, সেখানে কেন সারি সারি মৃতদেহ ভাসবে? পশ্চিমবঙ্গের বিদ্বজ্জনেরা মনে করছেন, নদীতে ভেসে আসা মৃতদেহ যেন বলে দিচ্ছে—ভারতের জন্য যেই ধরনের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল, ভারত সেখানে ব্যর্থ হয়েছে। করোনার আগেও ভারত বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখত, কিন্তু সেখানকার পত্রপত্রিকা প্রশ্ন তুলছে যে, বড় বিপদে দেশটির বেশিরভাগ নাগরিককে চিকিত্সা দেবার সাধ্য ভারতের এখনো হয়ে ওঠেনি। ন্যূনতম অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যুকে সেখানে গণহত্যার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

যুগে যুগে ভারত উপমহাদেশে অনেক মহামারি হয়েছে। আঠারো কিংবা উনিশ শতকে কলেরা, প্লেগ কিংবা গুটিবসন্ত রোগে যখন জনপদ উজাড় হয়ে যেত, মানুষ তখন শেষ পর্যন্ত প্রিয়জনের শেষকৃত্য পালন করতে না পেরে  মৃতদেহখানি ভাসিয়ে দিত নদীর পানিতে। শরত্চন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাস থেকে শুরু করে অনেকের লেখাতেই এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু মধ্যযুগের সামন্ততন্ত্র বা উনিশ শতকের উপনিবেশের সঙ্গে কেন এমন মিল থাকবে বর্তমান ভারতের? এটা নিয়ে কোটি টাকার প্রশ্ন তুলেছে সে দেশের গণমাধ্যমগুলি। কারণ, ভারতে রয়েছে বিশ্বের জনবহুলতম গণতন্ত্র। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের দীপশিখা সেখানে কখনো অনুজ্জ্বল হয়নি। গণতন্ত্রই দেশটির একতার শক্তি। দেশটির একশো চল্লিশ কোটি নাগরিকের জীবনের অধিকার, এবং মৃত্যুর পরেও সম্মানের অধিকার, রক্ষা করবার দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের ওপরেই বর্তায়। সেখানকার পত্রপত্রিকা কড়া ভাষায় বলছে যে, দিল্লির শাহেনরা এখন জানেন কেবল দুইটি মন্ত্র—আধিপত্য এবং আনুগত্য।

সেই আধিপত্য কায়েমের একটি উদগ্র চিত্র দেখা গেছে এবারের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে। এমনকি ভারতের সুপ্রসিদ্ধ নির্বাচন কমিশনের প্রতিও নানান সময়ে পক্ষপাতের আঙুল তুলেছে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত দল তৃণমূল কংগ্রেস। আনন্দবাজার পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে—‘অনেক দিন ধরিয়াই এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যকলাপ সমপর্কে বিস্তর অভিযোগ। তবে নরেন্দ্র মোদীর জমানায় সেই অভিযোগ এক ভিন্ন মাত্রা অর্জন করিয়াছে। প্রশ্ন উঠিয়াছে: গণতন্ত্রের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষার মহান দায়িত্ব পালন করিবার ভার যাহার হাতে, সেই নির্বাচন কমিশন কি কেন্দ্রীয় সরকারের তথা শাসক দলের স্বার্থরক্ষী হিসাবেই কাজ করিতেছে? পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এই প্রশ্ন যে বিপুল আকার ধারণ করিল তাহার ছায়া এখনও ঘনঘোর। এই পরিপ্রেক্ষিতেই প্রশ্ন উঠিতে পারে, নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করিবার পূর্ণ অধিকার যদি সরকারের হাতে থাকে, তাহা হইলে অনুগত জনদের কমিশনের চালকের আসনে বসাইবার সম্ভাবনা বাড়িয়া যায় নাকি? বর্তমান নির্বাচন কমিশনের চালকরা আনুগত্যের প্রতিমূর্তি কি না, তাহা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের চালকরা স্পষ্টতই সেই আনুগত্য আদায় করিতে ব্যগ্র। এই কারণেই নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নিয়োগের বিষয়ে নূতন করিয়া ভাবা দরকার।’

কেন্দ্রীয় শাসকদল তাদের আরো একটি সাংবিধানিক পদের অপব্যবহার করছে বলে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর মানুষের। সেই পদটির নাম রাজ্যপাল। কিন্তু কয়েকদিন আগেই রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় টুইট করে জানিয়েছিলেন, ভোট পরবর্তী রাজনৈতিক হিংসা যে সমস্ত জায়গায় হয়েছে, সে সব এলাকায় যাবেন। তিনি যাচ্ছেনও বেছে বেছে একটি নির্দিষ্ট দলের হিংসার এলাকায়। তিনি পুলিশকে ধমকাচ্ছেন, চমকাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার পক্ষের উপ মুখ্য সচেতক মনে করেন, রাজ্যপাল আসলে হতাশ। কারণ, তিনি একটি মিশন নিয়ে এসেছিলেন বা তাঁকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু হাজারো টুইট ও সাংবাদিক সম্মেলন করেও রাজ্যপাল সেই মিশনে ফেল করছেন।

এর প্রমাণ অবশ্য অনেকেই দেখেছেন। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে নিয়োগ পাওয়া বর্তমান রাজ্যপাল সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনের আগে বোলপুরে গিয়ে বলেছেন—রাজ্যে পরিবর্তন আসা উচিত। এমনকি গত ডিসেম্বর ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে  ৩৫৬ ধারা জারি করে সরকার ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির শোরগোল তুলেছিল বিজেপি। সেসময় ১৫৬-এর ১ উপধারা প্রয়োগ করে জগদীপ ধনখড়কে রাজ্যপাল পদ থেকে সরানোরও পালটা দাবি তুলেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের সারস্বত সমাজও বলছেন যে, স্বাধীনতার পর পশ্চিম বাংলার শেষ গভর্নর ছিলেন সিআর রাজা গোপালাচারী। সেখানে প্রথম রাজ্যপাল পদে বসেন হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে ইতিহাসবিদ সৈয়দ নুরুল হাসান, বিশিষ্ট প্রশাসক ভৈরব দত্ত পা্লে এবং কিছুদিন আগে পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকেও রাজ্যপাল হিসেবে পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন বিশিষ্ট মানুষ। গত বছর জুলাইয়ে পশ্চিম বাংলায় জগদীপ ধনখড় নতুন রাজ্যপাল হিসেবে নিযুক্ত হয়ে প্রথম দিন থেকেই রাজ্য সরকার, সাধারণ প্রশাসন এবং পুলিশের বিরুদ্ধে লাগাতার ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আসছেন। ভারতের সংবিধানে নির্দিষ্টভাবে বলা রয়েছে যে রাজ্যপাল নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। শুধুমাত্র কিছু ঔপচারিক ক্ষমতা রয়েছে তার হাতে। কোনো বিষয়ে জানতে চাইতে পারেন উনি, কিন্তু রাজ্য মন্ত্রিসভার পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজ করতে পারেন না। কিন্তু সেই সাংবিধানিক লক্ষণরেখা বারংবার অতিক্রম করেছেন রাজ্যপাল। সব দেখেশুনে পশ্চিমবঙ্গের বিদ্বজ্জনেরা মনে করছেন—জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকারকে (তৃণমূল কংগ্রেসকে) অসুবিধায় ফেলতে, বিরুদ্ধাচারণ করতে এবং পক্ষান্তরে কেন্দ্রে যারা ক্ষমতায় রয়েছে, তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করতে দিল্লির শাহেনশাহদের নির্দেশে এখানে এসেছেন রাজ্যপাল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী কেন্দ্রীয় সরকারের আচরণে বিভিন্ন সময় তার তীব্র অসন্তোষের কথা বলেছেন। তিনি সম্প্রতি অভিযোগ করে বলেছেন, ‘এদের (কেন্দ্রীয় সরকারের) কি সৌজন্য বলে কিছু নেই? এই সরকার শপথ নেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় টিম পাঠিয়ে দিল! ল্যান্ডস্লাইড ভিকট্রি হয়ে একটা সরকার গঠিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা তো রাজ্যের বিষয়। কেন কেন্দ্রীয় দল এলাকায় অহেতুক উত্তেজনা ছড়াবে? এরা শুধু বিজেপির সমর্থকদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা তো টিএমসি, এসইউসিআই আর কারোর বাড়ি যাচ্ছে না। আমাদেরও তো অনেক লোক মারা গিয়েছে...।’ এখানে উল্লেখ থাকে যে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরবর্তী হিংসা দমনে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের হাইকোর্ট।

পশ্চিমবঙ্গের এই অস্থিরতার সঙ্গে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতির মধ্যে অনেকে মিল খুঁজে পান। আমরা ছোট্ট একটা উদাহরণ দিতে পারি—১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মওলানা ভাসানী, আবুল কাশেম ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী কর্তৃক গঠিত যুক্তফ্রন্ট অভূতপূর্ব জয়লাভ করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে পরাভূত হয়। তারা শুধু ৯টি আসন লাভ করে। হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান প্রণয়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন সোহ্রাওয়ার্দী। কিন্তু পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইসকান্দার মির্জা ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন। অতঃপর ২৭ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন জেনারেল আইয়ুব খান। সেসময় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, মনসুর আলী, তাজউদ্দীন আহমদসহ শত শত নেতা এবং হাজার হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। সামরিক স্বৈরশাসকের দমন, নিপীড়নের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অপরাধ দেখিয়ে ১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হয়।

ভারত গণতান্ত্রিকভাবে মহান একটি দেশ। অথচ ভারতে এখনো রাষ্ট্রদ্রোহ তকমা দিয়ে অনেক গণতান্ত্রিক অধিকারকে দমন করা হয়। এ ব্যাপারে একটি বিখ্যাত পত্রিকায় ‘গণতন্ত্রের কলঙ্ক’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে—“বর্তমান শাসকরা যে সরকারের বিরোধিতাকেই রাষ্ট্রদ্রোহ মনে করেন, মন্ত্রী-সান্ত্রিদের অনেকের কথাতেই তাহা ক্রমাগত ফাঁস হইয়া যায়। এই অন্ধকার হইতে ভারতকে যদি মুক্তি খুঁজিতে হয়, তবে মৌলিক পরিবর্তনের দাবি জানাইতে হইবে। ...প্রসঙ্গত, ১৯৫১ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রদ্রোহ আইনকে ‘জঘন্য’ (অবনকশাস) আখ্যা দিয়াছিলেন। ভারতের দুর্ভাগ্য, সেই নিন্দা তাঁহার ব্যক্তিগত উচ্চারণ হিসাবেই থাকিয়া গিয়াছে, নেহরুও আইনটি রদ করিতে উদ্যোগী হন নাই। নরেন্দ্র মোদী বা তাঁহার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট সেই উদ্যোগের প্রত্যাশা পাগলেও করিবে না। কিন্তু গণতান্ত্রিক ভারতের কর্তব্য, এই বিষয়ে জোরদার দাবি তোলা। সেই দাবি হইতে পারে স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পূর্তি উদ্যাপনের একটি উজ্জ্বল মাইলফলক।”

গণতান্ত্রিক ভারতের অতীতের একটি গৌরবোজ্জ্বল একটি দিক রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, ভারত অতীতে কী করেছে আর এখন কী করছে! সে কারণে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ঘটনার ঘনঘটায় অনেকেই মনে করেন, পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে ভারতের শিক্ষা নেওয়ার অনেক কিছু আছে।

(মাটিভাঙা, পিরোজপুর)