ইসরাইলের আগ্রাসি হামলা

গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ

আপডেট : ১৭ মে ২০২১, ০০:৫৬

গাজায় আগ্রাসি হামলার তীব্রতা আরো বাড়িয়েছে ইসরাইল। গতকাল রবিবার ভোরের আগেই নতুন করে বিমান হামলায় গাজার তিনটি স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এতে অন্তত ৪২ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ জন শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া আরো অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছেন। গত সোমবার থেকে শুরু হওয়া বর্বরোচিত এ হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৮ জনে, যাদের মধ্যে ৫৫ জন শিশু এবং ৩১ নারী রয়েছেন। গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরাইল। শত শত ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে হামাসের রকেট হামলায় ইসরাইলে দুই শিশুসহ ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু গাজায় হামলা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, হামাসের রকেট হামলা থেকে আত্মরক্ষার অধিকার ইসরাইলের আছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে ফোনালাপের পর এ কথা বলেন। যদিও তার অবস্থান নিজ দলের মধ্যেই বিভেদ তৈরি করেছে। ওআইসি ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। গতকাল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠকে শুরু হয়েছে। তবে রাতে এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানা যাযনি। ইইউও বৈঠকে বসছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন দেশ ইসরাইলি হামলার নিন্দা জানিয়েছে। বিশ্ব জুড়ে ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের পক্ষে-বিপক্ষে বিক্ষোভও হয়েছে।

একই পরিবারের আট শিশুসহ ১০ জন নিহত

গাজা শহরের পশ্চিমে শনিবার একটি শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি বিমান হামলায় এক পরিবারের ১০ জন সদস্য নিহত হন, যাদের মধ্যে আট জন শিশু ও দুই জন নারী। ঐ পরিবারে শুধু পাঁচ মাসের শিশু ওমর আল-হাদিদি বেঁচে যায়। হামলায় শিশুটির মা, চার ভাইবোন এবং পরিবারের আরো পাঁচ সদস্য মারা যান। শিশুটির বাবা মোহাম্মদ আল-হাদিদি তখন বাড়িতে ছিলেন না। তিনি আক্ষেপের স্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘সেখানে কোনো রকেট ছিল না, কেবল নারী ও শিশুরা ছিল, শিশুরা শান্তিপূর্ণভাবে ঈদ উদ্যাপন করছিল, তারা এমন কী করেছিল যে এভাবে মরতে হলো? এসব শিশু মামার বাড়িতে ঈদ উদ্যাপন করতে এসেছিল।’

ইসরাইলের সেনাবাহিনীর দেওয়া হিসাবেই শনিবার পর্যন্ত গাজার ৬৫০টি টার্গেটে বিমান হামলা হয়েছে। অর্থাত্ গত সোমবার থেকে গড়ে প্রতিদিন একশ থেকে দেড়শ বার ইসরাইলি যুদ্ধ বিমান গাজায় উড়ে গিয়ে বোমা ফেলেছে। সেইসঙ্গে চলছে সীমান্ত থেকে দূরপাল্লার কামানের গোলা।

ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্স (আইডিএফ) জানিয়েছে, রবিবার তারা হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইয়েহইয়েহ সিনওয়ার বাড়িতেও হামলা চালিয়েছে। স্থাপনাটি তাদের সামরিক অবকাঠামো হিসেবে ব্যবহূত হতো বলে দাবি করা হয়। আইডিএফ জানায়, হামাস কয়েক শ রকেট নিক্ষেপ করেছে যাতে দুই শিশুসহ ১০ ইসরাইলি নিহত হয়েছেন। শনিবার থেকে রবিবারের মধ্যেই ১২০টি রকেট নিক্ষেপ করেছে হামাস। হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়ে শনিবার কাতারের দোহায় ফিলিস্তিনপন্থিদের একটি র্যালিতে বলেছেন, ইসরাইলের হামলা অব্যাহত থাকলে প্রতিরোধ উচ্চস্তরে বাড়বে।

অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেছেন, দেশটির সামরিক বাহিনী যতক্ষণ প্রয়োজন, গাজায় হামলা অব্যাহত রাখবে। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গনতেজও জানিয়েছেন, ইসরাইল উত্তেজনা বাড়াতে চায় না। কিন্তু যে কোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি। তাদের এই বক্তব্যের মধ্যেই ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিক হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত এক সপ্তাহের হামলায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮৮ জনে। এর মধ্যে ৫৫ জন শিশু এবং ৩১ নারী রয়েছেন। আহতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধে ২ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে, যাদের মধ্যে সাড়ে ৫০০’র বেশি শিশু।

নেতানিয়াহু ও আব্বাসের সঙ্গে বাইডেনের ফোনালাপ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাইডেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে বলেছেন, তিনি ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারকে সমর্থন দিয়ে যাবেন। হোয়াইট হাউজ এ তথ্য জানিয়েছে। তিনি দুটি অংশেই মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং টাওয়ার ব্লকে হামলার পরে তিনি সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাইডেন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট আব্বাসের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি তাকে বলেছেন, তিনি মার্কিন-ফিলিস্তিন অংশীদারিত্ব জোরদার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরো বলেছেন, ইসরাইলে হামাসের রকেট নিক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। প্রেসিডেন্ট আব্বাসের দপ্তর অধিকৃত পশ্চিম তীরে। এ কারণে হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজায় তার নিয়ন্ত্রণ বেশ সীমিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হামাসের সঙ্গে কথা বলবে না। কারণ তারা হামাসকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করে। বাইডেন দুই নেতাকে বলেছেন যে তিনি এই দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব সমাধানের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ। ইসরাইল, ফিলিস্তিনি এবং জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হ্যাডি আমির তেলআবিব রয়েছেন।

সংঘাত পশ্চিম তীরেও

এদিকে শুক্রবার পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনতা ও ইসরাইলের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। গাজায় ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন হেব্রন ও নেবলুস শহরে। এসময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হন। প্যালেস্টাইন রেড ক্রস গ্রুপ জানিয়েছে, পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে শনিবার সকালে প্রায় দুই হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।

ওআইসির নিন্দা, বৈঠকে বসছে জাতিসংঘ ও ইইউ

জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে হামলার ঘটনায় বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি মিডিয়া ভবনে হামলার ঘটনারও নিন্দা জানিয়েছেন। এদিকে রবিবার রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। ৫৭ দেশের অর্গানাইজেন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (ওআইসি) এক জরুরি বৈঠকে ইসরাইলি হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের পর এটি তাদের প্রথম উদ্যোগ।

পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া

ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা জরুরি আলোচনায় বসবেন মঙ্গলবার। এরই মধ্যে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রঁ শুক্রবার নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেছেন। গাজা থেকে রকেট হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি অঞ্চলটিতে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গতকাল জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাইকো মাস পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে টুইটারে বলেছেন, যে বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত পরিণতি বয়ে আনতে পারে। সহিংসতা থামিয়ে দুই পক্ষকে দুই রাষ্ট্রবিষয়ক আলোচনায় ফেরার আহবান জানান। নিরীহ মানুষজন হতাহত হওয়া ও শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযোগ করেছে, হামলার মাধ্যমে ইসরাইল যুদ্ধাপরাধ করেছে। চীন দ্রুত জাতিসংঘের বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটি এই পরিস্থিতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। —বিবিসি, ডয়চেভেলে ও সিএনএন।